নির্বাচনে বিএনপি কেন ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে?
- আপডেট সময় : ১২:০৯:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 49
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারপর্বের মাঝামাঝি সময়ে এসে ভোটপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে ‘চক্রান্ত’ হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলছে বিএনপি।
দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনি জনসভায় বলেছেন, নির্বাচন বানচাল করতে একটি বা একাধিক মহল গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও।
এই বক্তব্য কি কেবল রাজনৈতিক কৌশল বা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা? নাকি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বাস্তব কোনো উদ্বেগ কাজ করছে—এই প্রশ্ন ঘুরছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য এবং দলের চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মূল উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপিকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—জামায়াতের নারী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং জামায়াত আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ হওয়ার ঘটনা, যার জন্য ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বিএনপিকে দায়ী করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি নেতাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, শেষ মুহূর্তে জামায়াত–এনসিপি জোট নির্বাচন থেকে সরে যেতে পারে। এমন কিছু ঘটলে পুরো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সহায়তার জন্য ১৬ হাজার বিএনসিসি সদস্যকে যুক্ত না করার দাবিও তুলেছে বিএনপি। দলটির নেতাদের আশঙ্কা, বিএনসিসি সদস্যদের মধ্যে শিবিরের কর্মী থাকলে তারা ভোট পরিচালনার দায়িত্বে চলে আসতে পারেন।
এ ছাড়া ঢালাওভাবে বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, মহানগর এলাকায় ‘অস্বাভাবিক’ ভোটার স্থানান্তর এবং নির্বাচনি প্রচারে ধর্মীয় আবেগ ব্যবহারের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরেছে বিএনপি।
বাজারে আরেকটি গুঞ্জন রয়েছে—দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ তুলে বিএনপির কয়েক ডজন প্রার্থীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট হতে পারে। এটিও দলটির নেতাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিএনপি কোথায় চক্রান্ত দেখছে—এ প্রশ্নে দলের স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন,
“জামায়াত হার বুঝে গেছে। তাই নির্বাচন বিতর্কিত করতে চায়, নির্বাচন থেকে সরে যেতে চায়। আওয়ামী লীগও আছে—তারাও নির্বাচন বানচাল করতে চাইতে পারে।”
দলের উচ্চপর্যায়ের আরেক নেতা মনে করছেন, নির্বাচন ঘিরে অনেক পক্ষ সক্রিয়। তাঁর ভাষায়,
“সবচেয়ে জটিল হচ্ছে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা।
তাছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াত মুখোমুখি অবস্থানে। গণভোট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে।”
তবে বিএনপির উদ্বেগ আসলে কতটা—এ প্রশ্নে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন,
“বিএনপির উদ্বেগ নেই। কিন্তু বিষয়গুলো পয়েন্ট আউট করতে হচ্ছে, কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি সমস্যা আছে—হার মেনে নিতে না চাওয়া।”
২০০১ সালের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার বক্তব্যের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন,
“শেখ হাসিনা হেরে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সুক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে’। এই মানসিকতা রাজনীতিতে আছে। হার–জিত থাকবে, কিন্তু হার মেনে না নেওয়া গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়।”
তিনি আরও বলেন,
“যখন কেউ বুঝতে পারে সে হারছে, তখন নানা বক্তব্য দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা দেখা যায়।”
২৯ জানুয়ারি রাজশাহীতে নির্বাচনি সভায় তারেক রহমান অভিযোগ করেন,
“নির্বাচন নিয়ে একটি মহল ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে।”
৩১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের সভায় তিনি বলেন,
“এখনো কোনো কোনো মহল চেষ্টা করছে কীভাবে ভোটকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়।”
এর আগের দিন, ৩০ জানুয়ারি রংপুরের সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন,
“সাবধান! চক্রান্ত শুরু হয়ে গেছে। ১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, এখন তারাই নির্বাচন বানচাল করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।”
সোমবার যশোরের সভায় তারেক রহমান আবার বলেন,
“নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে একটি রাজনৈতিক দল উঠে পড়ে লেগেছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”
নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর জামায়াত নারীদের মধ্যে সাড়া পাচ্ছে—এমন আলোচনার মধ্যেই গত শনিবার জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি নারীবিদ্বেষী পোস্ট পরিস্থিতিকে নতুন দিকে নিয়ে যায়।
পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। নয় ঘণ্টা পর জামায়াত দাবি করে, ওই অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
পোস্টে বলা হয়েছিল,
“নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত—এটা আমরা বিশ্বাস করি না। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটি অনুমোদন করেননি।”
এবং আরও বলা হয়,
“আধুনিকতার নামে নারীদের ঘর থেকে বের করলে তারা শোষণ ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে—এটি পতিতাবৃত্তির আরেক রূপ।”
এই পোস্টের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল বিক্ষোভ করে। বিভিন্ন দলের নারী প্রার্থীরাও বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানান।
সোমবার খুলনার সভায় তারেক রহমান জামায়াতের নারীনীতির সমালোচনা করে বলেন,
“যে দল নির্বাচনের আগে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে এভাবে অপমান করে, তারা ক্ষমতায় এলে আচরণ কী হবে—ভেবে দেখুন।”
জামায়াতের ‘হ্যাক’ দাবিকে নাকচ করে তিনি বলেন,
“বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচনের আগে একজন সিনিয়র নেতা এভাবে মিথ্যা বলছেন।”
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সন্দেহের আঙুল তোলেন বিএনপির দিকেই। তিনি বলেন,
“শেষ মুহূর্তে কালো টাকা, প্রশাসন, সন্ত্রাস ও মিডিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে আমাদের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে মিথ্যাচার ছড়ানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“যারা সঙ্গে সঙ্গে কর্মসূচি দিয়েছে, তারাই এসব করেছে। এগুলোই নির্বাচন নিরপেক্ষ হওয়ার পথে বড় বাধা।”
জামায়াতকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে পরওয়ার বলেন,
“শেরপুরে শ্রীবরদী উপজেলায় জামায়াতের সেক্রেটারিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ থাকার পরও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।”
তিনি দাবি করেন,
“আমাদের নারী কর্মীদের ওপর অন্তত নয়–দশ জায়গায় হামলা হয়েছে। বিএনপির লোকেরা বক্তৃতায় বলছে দাঁড়িপাল্লার ভোট চাইলে নারীদের কাপড় খুলে নিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“হিন্দুদের ভয় দেখানো হচ্ছে—দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে ১৩ তারিখে কী হবে। সরকার সিরিয়াস না হলে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি না—এ নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে।”
এই বক্তব্যের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন,
“আমরা স্বাভাবিক নির্বাচন করছি। তারা যদি শেষ মুহূর্তে সরে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে—নির্বাচনের নয়।”
এখন পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। তবে জামায়াতের মহিলা বিভাগ ও এনসিপি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া রোববার রংপুরের এক সভায় বলেন,
“যদি আগে থেকেই বোঝা যায় কে প্রধানমন্ত্রী হবে বা কোন দল জিতবে, তাহলে ১১–দলীয় জোট কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত থাকবে।”

















