ঢাকা ০৪:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

নানকার স্মৃতিসৌধ : কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সাংস্কৃতিক কমান্ড

৫২ বাংলা
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৪:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৮
  • / 3457
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

 

ক.

আজকের বিয়ানীবাজারকে একটা সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। এ জনপদের মানুষগুলোর পূর্বসুরীদের কথা বার বার উচ্চারিত হয় বিভিন্ন ভাবেই। সমাজ-সভ্যতার প্রগতির চাকায় সেই পূর্বসূরীরা আমাদের আলোকবর্তিকা হিসেবে এখনও পথ দেখাচ্ছেন। সাহিত্যে মহেশ্বর ন্যায়লংকার থেকে শুরু করে অনেক সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবিদের প্রজ্ঞার প্রতিফলন হয়েছিলো সেই আদিকালে। বিয়ানীবাজার এবং আরও কিছু এলাকার মিলিত নাম ছিল পঞ্চখন্ড। এই পঞ্চখন্ড ছিল পন্ডিতদের চারণ ভূমি। আর সে কারণেই আজকের বিয়ানীবাজার পরিচিত ছিল সে আমলের ‘ক্ষুদে নবদ্বীপ’ হিসেবে। ঠিক সেভাবেই সংগ্রাম কিংবা সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে এ এলাকার মানুষের আত্নদান কিংবদন্তি হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়।

খ.
অগ্নিযুগে বাংলার মানুষ জড়িয়ে ছিলো অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। ব্রিটিশদের শাসন-শোষন থেকে স্বাধীনতা পেতে সারা ভারতের মানুষের সাথে এই বিয়ানীবাজার কিংবা পঞ্চখন্ডের সংগ্রামী মানুষগুলোও জড়িয়ে ছিলো। নেতৃত্বের সারিতে ছিলেন ছইদ আলীর (কংগ্রেস নেতা) মতো অনেকেই। সংগ্রাম আর রক্তাক্ত ইতিহাস পেরিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও সামন্ততান্ত্রিক শোষন যেন আরও পোক্ত হয়। ব্রিটিশদের জিইয়ে রাখা শ্রেণী আর বৈষম্যের যাতাকলে পিষ্ট হতে থাকে অখন্ড পাকিস্থানের অগণিত মানুষ। ব্রিটিশদের তৈরী করা শোষক শ্রেণী দেশ বিভাগের পর দাপটের সাথেই রাজত্ব করতে থাকে। জমিদারী শোষনে শ্রমজীবী মানুষগুলো নিষ্পেশিত হতে হয় বংশ পরম্পরায়। আজকের ইতিহাসে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাটা উচ্চারিত না হলেও এই ব্যবস্থায় মানুষকে নির্যাতন নিগ্রহ করা ছিলো তৎকালিন জমিদারদের নিত্যদিনের সংস্কৃতি। মুখ আর চোখ বুজে সহ্য করতে হতো এসব নির্যাতন। এই নির্যাতন-নিপিড়ন দিনের পর দিন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সয়ে যেতে হয়েছে শ্রমজীবী মানুষগুলোকে ,অনাহার-অর্ধাহারকে তাদের নিয়তি ভেবেই ।
কিন্তু ইতিহাসের একটা অনিবার্যতার কাছে শোষন-নির্যাতনকারীদেরও হোচট খেতে হয়েছে। ক্ষমতা-দম্ভ-রাষ্ট্র সকল রক্তচক্ষুর বিপরীতে গিয়ে মানুষ যে কিভাবে এগিয়ে আসে, তা-ই আমাদের দেখিয়ে দেয় ইতিহাস। কখন কিভাবে যে প্লট তৈরী হয়, কিভাবে নেতা তৈরী হয়ে যায়, শুধু আন্দোলন-সংগ্রামের অধ্যায়েই আমরা তার পাঠ নেই। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে জঘন্য এবং নির্মম-নিকৃষ্ঠ যে রুপটি, তা হলো নানকার প্রথা। শুধুমাত্র নান’র (রুটি) বিনিময়ে অর্থাৎ কোনরকম অর্ধাহারে ধুকে ধুকে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা (!) দিয়ে জমিদাররা তাদের সকল কাজ করিয়ে নিতো নানকার প্রজাদের নিয়ে। ঐ শ্রমিকদের নারীরাও ব্যবহৃত হতো এদের নিজস্ব পন্য হিসেবে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। অর্ধশতাব্দিরও বেশী কাল চলেছে এই বর্বরতা। মানবতার যে প্রথাটির কথা এমনকি ধারনায় নিলে মনে হয়, কি বর্বর অমানবিকতায় ঐ জমিদাররা নির্যাতন করেছে আমাদের মানুষদের। আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগের এই নির্মমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো বিয়ানীবাজারের মানুষ। জমিদারদের ঐ নির্যাতন আর পাশবিকতা মেনে নিতে পারে নি যেমন শ্রমজীবী মানুষ ঠিক তেমনি মেনে নিতে পারে নি জামিদারদের রক্ত-প্রবাহিত শিক্ষিত-সংস্কৃতিবান রাজনীতিবিদ।

গ.
তৎকালিন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তরুণ নেতা জমিদারদেরই বংশধর কমরেড অজয় ভট্টাচর্য স্থানীয়ভাবে সংগঠিত করতে থাকেন এ এলাকার আন্দোলন। এছাড়া ছিলেন কমরেড সুরত পাল, কমরেড অনিতা পাল,কমরেড অণিতা পালসহ অনেকেই। তাঁদের নেতৃত্বে বিয়ানীবাজারের শানেশ্বর-উলুউরি গ্রাম গর্জে উঠে। কমিউনিস্ট পার্টির ছায়াতলে মানুষ তাদের অধিকার নিয়ে জড়ো হয়। শুরু হয় নতুন বিপ্লবের জন্যে জান বাজি রাখা যুদ্ধ, শাষকের বিরুদ্ধে, শোষন মুক্তির লক্ষ্যে। মুক্তির লড়াই, অথচ অপপ্রচার ছিলো এটা ধর্মদ্রোহীদের আন্দোলন। যুগে যুগে এভাবেই ধর্ম ব্যবহৃত হয়, ধর্মকে ব্যবহার করেই আজও প্রগতির পথ রুদ্ধ করতে চায় যেমন উগ্র ধার্মিকরা এই বাংলাদেশে, ঠিক তেমনি ধর্ম-নিয়ন্ত্রিত দেশ ভারতেও এর বিস্তার যেন রুদ্ধ করা যাচ্ছে না। কিন্তু কোন অপপ্রচারেই তখন সাধারন মানুষকে দমাতে পারে নি কেউ। শোষিত মানুষ আর ঘরে ফেরেনি। রক্তস্নাত হয় শানেশ্বর আর উলুউরী গ্রাম। সোনাই নদী তীরবর্তী স্থানে আন্দোলনরত মানুষের উপর গুলি চালায় পাকিস্থানী শাষকের তাবেদার বাহিনী অর্থাৎ মুসলিম লীগ সরকার। রজনী দাশ, ব্রজনাথ দাশ, প্রসন্ন কুমার দাস, পবিত্র কুমার দাস, অমূল্য কুমার দাস, কুটুমনি দাসের রক্তের ধারা গড়ায় সোনাই নদীর স্রোতধারায়। বিপ্লবীদের রক্তস্রোতে শোষক তথা রাষ্ট্রক্ষমতার ভিতে কাঁপন ধরায়। ১৮ আগষ্ট ১৯৪৯ সনের শানেশ্বর-উলুউরীর এই রক্তই শেষ পর্যন্ত সারা পূর্ববঙ্গে নানকার প্রথা বিলুপ্তি টানে। পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার।
শোষন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ত্রিশের দশকে শুরু হওয়া টংক-তেভাগা-নানকার আন্দোলন মুক্তিকামী মানুষের বীরত্বগাঁথারই আন্দোলন। মুক্তির সংগ্রামে সাধারণ মানুষের বিজয়ী হবার অধ্যায় এগুলো। বিয়ানীবাজার তথা সারা পূর্ব পাকিস্থানেই নানকার আন্দোলন কমিউনিস্টদের ছিলো একটা সফল আন্দোলন, মানব মুক্তির সংগ্রামের এক অনন্য বিজয়।
ঙ.

স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৮৬ সালে বিয়ানীবাজারে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির একটা শাখা হয়। এ সময় আমি এ শাখার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হই। এসময়টাতেই প্রথম নানকার স্মৃতি রক্ষার ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেসময়টাতে সিপিবি’র উপজেলা কমিটিতে যারা ছিলেন তারাই ছিলেন এর প্রধান দায়ীত্বে। পাশাপাশি তৎকালিন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার ছাত্রকর্মীদের কঠোর পরিশ্রমে চলতে থাকে সেখানে সৌধ নির্মানের তৎপরতা। স্থানীয় মানুষের সাথে যোগাযোগ অর্থ সংগ্রহ, বার বার শানেশ্বরে গিয়ে জায়গা নির্ধারণ প্রভৃতি চলতে থাকে উদ্যমের সাথেই।
একটা কথা এখানে বলে রাখি, তখন শীতের সময়গুলোতে আমরা লঞ্চেই যেতাম শানেশ্বরে। সকালের লঞ্চ ধরে সেখানে গিয়ে সম্ভবত বিকেল ৩টার শেষ লঞ্চের সময়টার আগেই আমাদের শেষ করতে হতো সব কাজ। যে যেভাবেই দেখুক না কেন, নানকার আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর আন্তরিকতাই আমাদের প্রাণিত করত এগিয়ে যেতে। ইতিহাসের নির্মম সত্যটাকে জিইয়ে রাখতে সেসময়টাতে তাই তৎকালিন ছাত্র ইউনিয়নের তরুণরা দল বেঁধে যেতো, আজকের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মনিয়া, মর্তুজা, মিজান, মাহবুব, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কুনু, এনু, আরও কত কত নাম। বিকেলে শেষ সূর্য মাথায় নিয়ে আমরা যখন লঞ্চে উঠতাম, মনে হতো ইতিহাসের গর্ভে বিলীন হতে থাকা একটা অধ্যায়কে আমরা তোলে আনছি, গর্ব আর স্পর্ধার জায়গাটার ভীত রচনা করছি আমরা। সংগ্রাম-সাফল্যের সৌধ নির্মাণ হবে। রজনী দাশ, ব্রজনাথ দাশ, প্রসন্ন কুমার দাস, পবিত্র কুমার দাস, অমূল্য কুমার দাস, কুটুমনি দাস—- ইতিহাসের পাতায় পাতায় আবারও সগর্বে উচ্চারিত হবে এই নামগুলো।
ছ.
১৯৮৮ সালে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড বারীন দত্তের (আব্দুছ ছালাম) উপস্থিতিতে প্রথম একটা জনসভা হয়। সময়ের স্রোতধারায় ১৯৯১ সনে কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে স্থানীয় জনগনের সহযোগীতায় তৎকালিন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আজকের বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী (নুরুল ইসলাম নাহিদ) এর নেতৃত্বে সোনাই নদীর তীর ঘেষে নানকার আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়।
তারপর সময় আমাদের ঠেলে দেয় কোন্ অজানায়, আমরা কোন না কোনভাবে দেশ ছাড়ি। একঝাক তরুণ যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দেয়। রাজনীতিতে হয় নতুন মেরুকরণ। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের ভাঙ্গনের সুর বাজে বাংলাদেশেও। সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার অনেক নেতাই পূঁজিবাদ আর মুক্তবাজার অর্থনীতির হাওয়ায় নিজেকে পাল্টে নেন। স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির হাওয়ার সে জাপটা বিয়ানীবাজারেও অনেক কিছুই পাল্টে দেয়। থমকে যায় নানকার স্মৃতি সৌধের কাজও।
জ.
কিন্তু এরপরও ইতিহাসের গতিধারার অনিবার্যতাকে রুখতে পারে না কেউই। কেউ না কেউ এগিয়ে আসে। প্রগতির ঝান্ডা যারা উড্ডিন রাখতে চায়, তারা যে রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী হোক না কেন, তারা আগায় । সেরকমই একটা সংগঠন বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড। সেই সংগঠনটির সার্বিক ব্যাবস্থাপনায় আজকের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় শেষ পর্যন্ত নানকার স্মৃতিসৌধ মাথা তোলে দাঁড়ায়। ইতিহাসের পাতায় নতুন সে অধ্যায় সূচিত হয় ২০০৯ সালে। কমিউনিস্ট পার্টির সাথে আরেকটা সংগঠনের নাম সংযুক্ত হয়, আর সেটা হলো বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড।
আশির দশকের শেষের দিকের বিপ্লবে উন্মাতাল করা সেই দিনগুলো এখনও ভাবতে গেলে স্মৃতিকাতর হয়ে যাই আমরা। হয়ত পারিনি টিকে থাকতে, কিন্তু সেই দীক্ষাই আমদের প্রাণিত করে, পথ দেখায় আগামীর দিকে। আর সেজন্যেই শিকড় খুঁজতে যাওয়া বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই যখন যাই, তখন সেই সৌধটা আমাকে টানে। নানকার স্মৃতি সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে সোনাই’র স্রোত দেখি, ভাবতে থাকি একদিন এই খরস্রোতা নদীর রক্তস্রোতই পাল্টে দিয়েছিলো সভ্যতার চাকা। সামন্তবাদের পতন ঘঠিয়েছিলো এ রক্তধারা, বর্বর জমিদারদের অত্যাচার-নির্যাতন-যৌনতা তথা শোষনের প্রাথমিক জাতাকল ভেঙ্গেছিল এ লাল রক্ত।
সোনাই নদীর সে স্রোত এখন নেই। ধীরে চলা সোনাই’র জলের মতোই এই সভ্যতায় যেন আটকে গেছে শৃংখল ভাঙ্গার শপথ। স্বপ্ন দেখি, অজয় ভট্টাচার্যদের মতে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে, কোটি কোটি জনতার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গড়বে একটা সুন্দর উজ্জল বাংলাদেশ।

ফারুক যোশী; কলামিস্ট, প্রধান সম্পাদক; ৫২বাংলা টিভি ডটকম।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

নানকার স্মৃতিসৌধ : কমিউনিস্ট পার্টি থেকে সাংস্কৃতিক কমান্ড

আপডেট সময় : ০৬:৩৪:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৮

 

ক.

আজকের বিয়ানীবাজারকে একটা সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। এ জনপদের মানুষগুলোর পূর্বসুরীদের কথা বার বার উচ্চারিত হয় বিভিন্ন ভাবেই। সমাজ-সভ্যতার প্রগতির চাকায় সেই পূর্বসূরীরা আমাদের আলোকবর্তিকা হিসেবে এখনও পথ দেখাচ্ছেন। সাহিত্যে মহেশ্বর ন্যায়লংকার থেকে শুরু করে অনেক সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবিদের প্রজ্ঞার প্রতিফলন হয়েছিলো সেই আদিকালে। বিয়ানীবাজার এবং আরও কিছু এলাকার মিলিত নাম ছিল পঞ্চখন্ড। এই পঞ্চখন্ড ছিল পন্ডিতদের চারণ ভূমি। আর সে কারণেই আজকের বিয়ানীবাজার পরিচিত ছিল সে আমলের ‘ক্ষুদে নবদ্বীপ’ হিসেবে। ঠিক সেভাবেই সংগ্রাম কিংবা সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে এ এলাকার মানুষের আত্নদান কিংবদন্তি হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়।

খ.
অগ্নিযুগে বাংলার মানুষ জড়িয়ে ছিলো অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে। ব্রিটিশদের শাসন-শোষন থেকে স্বাধীনতা পেতে সারা ভারতের মানুষের সাথে এই বিয়ানীবাজার কিংবা পঞ্চখন্ডের সংগ্রামী মানুষগুলোও জড়িয়ে ছিলো। নেতৃত্বের সারিতে ছিলেন ছইদ আলীর (কংগ্রেস নেতা) মতো অনেকেই। সংগ্রাম আর রক্তাক্ত ইতিহাস পেরিয়ে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও সামন্ততান্ত্রিক শোষন যেন আরও পোক্ত হয়। ব্রিটিশদের জিইয়ে রাখা শ্রেণী আর বৈষম্যের যাতাকলে পিষ্ট হতে থাকে অখন্ড পাকিস্থানের অগণিত মানুষ। ব্রিটিশদের তৈরী করা শোষক শ্রেণী দেশ বিভাগের পর দাপটের সাথেই রাজত্ব করতে থাকে। জমিদারী শোষনে শ্রমজীবী মানুষগুলো নিষ্পেশিত হতে হয় বংশ পরম্পরায়। আজকের ইতিহাসে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাটা উচ্চারিত না হলেও এই ব্যবস্থায় মানুষকে নির্যাতন নিগ্রহ করা ছিলো তৎকালিন জমিদারদের নিত্যদিনের সংস্কৃতি। মুখ আর চোখ বুজে সহ্য করতে হতো এসব নির্যাতন। এই নির্যাতন-নিপিড়ন দিনের পর দিন প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সয়ে যেতে হয়েছে শ্রমজীবী মানুষগুলোকে ,অনাহার-অর্ধাহারকে তাদের নিয়তি ভেবেই ।
কিন্তু ইতিহাসের একটা অনিবার্যতার কাছে শোষন-নির্যাতনকারীদেরও হোচট খেতে হয়েছে। ক্ষমতা-দম্ভ-রাষ্ট্র সকল রক্তচক্ষুর বিপরীতে গিয়ে মানুষ যে কিভাবে এগিয়ে আসে, তা-ই আমাদের দেখিয়ে দেয় ইতিহাস। কখন কিভাবে যে প্লট তৈরী হয়, কিভাবে নেতা তৈরী হয়ে যায়, শুধু আন্দোলন-সংগ্রামের অধ্যায়েই আমরা তার পাঠ নেই। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে জঘন্য এবং নির্মম-নিকৃষ্ঠ যে রুপটি, তা হলো নানকার প্রথা। শুধুমাত্র নান’র (রুটি) বিনিময়ে অর্থাৎ কোনরকম অর্ধাহারে ধুকে ধুকে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা (!) দিয়ে জমিদাররা তাদের সকল কাজ করিয়ে নিতো নানকার প্রজাদের নিয়ে। ঐ শ্রমিকদের নারীরাও ব্যবহৃত হতো এদের নিজস্ব পন্য হিসেবে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। অর্ধশতাব্দিরও বেশী কাল চলেছে এই বর্বরতা। মানবতার যে প্রথাটির কথা এমনকি ধারনায় নিলে মনে হয়, কি বর্বর অমানবিকতায় ঐ জমিদাররা নির্যাতন করেছে আমাদের মানুষদের। আজ থেকে সত্তর-আশি বছর আগের এই নির্মমতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলো বিয়ানীবাজারের মানুষ। জমিদারদের ঐ নির্যাতন আর পাশবিকতা মেনে নিতে পারে নি যেমন শ্রমজীবী মানুষ ঠিক তেমনি মেনে নিতে পারে নি জামিদারদের রক্ত-প্রবাহিত শিক্ষিত-সংস্কৃতিবান রাজনীতিবিদ।

গ.
তৎকালিন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তরুণ নেতা জমিদারদেরই বংশধর কমরেড অজয় ভট্টাচর্য স্থানীয়ভাবে সংগঠিত করতে থাকেন এ এলাকার আন্দোলন। এছাড়া ছিলেন কমরেড সুরত পাল, কমরেড অনিতা পাল,কমরেড অণিতা পালসহ অনেকেই। তাঁদের নেতৃত্বে বিয়ানীবাজারের শানেশ্বর-উলুউরি গ্রাম গর্জে উঠে। কমিউনিস্ট পার্টির ছায়াতলে মানুষ তাদের অধিকার নিয়ে জড়ো হয়। শুরু হয় নতুন বিপ্লবের জন্যে জান বাজি রাখা যুদ্ধ, শাষকের বিরুদ্ধে, শোষন মুক্তির লক্ষ্যে। মুক্তির লড়াই, অথচ অপপ্রচার ছিলো এটা ধর্মদ্রোহীদের আন্দোলন। যুগে যুগে এভাবেই ধর্ম ব্যবহৃত হয়, ধর্মকে ব্যবহার করেই আজও প্রগতির পথ রুদ্ধ করতে চায় যেমন উগ্র ধার্মিকরা এই বাংলাদেশে, ঠিক তেমনি ধর্ম-নিয়ন্ত্রিত দেশ ভারতেও এর বিস্তার যেন রুদ্ধ করা যাচ্ছে না। কিন্তু কোন অপপ্রচারেই তখন সাধারন মানুষকে দমাতে পারে নি কেউ। শোষিত মানুষ আর ঘরে ফেরেনি। রক্তস্নাত হয় শানেশ্বর আর উলুউরী গ্রাম। সোনাই নদী তীরবর্তী স্থানে আন্দোলনরত মানুষের উপর গুলি চালায় পাকিস্থানী শাষকের তাবেদার বাহিনী অর্থাৎ মুসলিম লীগ সরকার। রজনী দাশ, ব্রজনাথ দাশ, প্রসন্ন কুমার দাস, পবিত্র কুমার দাস, অমূল্য কুমার দাস, কুটুমনি দাসের রক্তের ধারা গড়ায় সোনাই নদীর স্রোতধারায়। বিপ্লবীদের রক্তস্রোতে শোষক তথা রাষ্ট্রক্ষমতার ভিতে কাঁপন ধরায়। ১৮ আগষ্ট ১৯৪৯ সনের শানেশ্বর-উলুউরীর এই রক্তই শেষ পর্যন্ত সারা পূর্ববঙ্গে নানকার প্রথা বিলুপ্তি টানে। পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার।
শোষন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ত্রিশের দশকে শুরু হওয়া টংক-তেভাগা-নানকার আন্দোলন মুক্তিকামী মানুষের বীরত্বগাঁথারই আন্দোলন। মুক্তির সংগ্রামে সাধারণ মানুষের বিজয়ী হবার অধ্যায় এগুলো। বিয়ানীবাজার তথা সারা পূর্ব পাকিস্থানেই নানকার আন্দোলন কমিউনিস্টদের ছিলো একটা সফল আন্দোলন, মানব মুক্তির সংগ্রামের এক অনন্য বিজয়।
ঙ.

স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৮৬ সালে বিয়ানীবাজারে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির একটা শাখা হয়। এ সময় আমি এ শাখার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হই। এসময়টাতেই প্রথম নানকার স্মৃতি রক্ষার ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবেই সেসময়টাতে সিপিবি’র উপজেলা কমিটিতে যারা ছিলেন তারাই ছিলেন এর প্রধান দায়ীত্বে। পাশাপাশি তৎকালিন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার ছাত্রকর্মীদের কঠোর পরিশ্রমে চলতে থাকে সেখানে সৌধ নির্মানের তৎপরতা। স্থানীয় মানুষের সাথে যোগাযোগ অর্থ সংগ্রহ, বার বার শানেশ্বরে গিয়ে জায়গা নির্ধারণ প্রভৃতি চলতে থাকে উদ্যমের সাথেই।
একটা কথা এখানে বলে রাখি, তখন শীতের সময়গুলোতে আমরা লঞ্চেই যেতাম শানেশ্বরে। সকালের লঞ্চ ধরে সেখানে গিয়ে সম্ভবত বিকেল ৩টার শেষ লঞ্চের সময়টার আগেই আমাদের শেষ করতে হতো সব কাজ। যে যেভাবেই দেখুক না কেন, নানকার আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর আন্তরিকতাই আমাদের প্রাণিত করত এগিয়ে যেতে। ইতিহাসের নির্মম সত্যটাকে জিইয়ে রাখতে সেসময়টাতে তাই তৎকালিন ছাত্র ইউনিয়নের তরুণরা দল বেঁধে যেতো, আজকের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মনিয়া, মর্তুজা, মিজান, মাহবুব, যুক্তরাজ্য প্রবাসী কুনু, এনু, আরও কত কত নাম। বিকেলে শেষ সূর্য মাথায় নিয়ে আমরা যখন লঞ্চে উঠতাম, মনে হতো ইতিহাসের গর্ভে বিলীন হতে থাকা একটা অধ্যায়কে আমরা তোলে আনছি, গর্ব আর স্পর্ধার জায়গাটার ভীত রচনা করছি আমরা। সংগ্রাম-সাফল্যের সৌধ নির্মাণ হবে। রজনী দাশ, ব্রজনাথ দাশ, প্রসন্ন কুমার দাস, পবিত্র কুমার দাস, অমূল্য কুমার দাস, কুটুমনি দাস—- ইতিহাসের পাতায় পাতায় আবারও সগর্বে উচ্চারিত হবে এই নামগুলো।
ছ.
১৯৮৮ সালে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় নেতা কমরেড বারীন দত্তের (আব্দুছ ছালাম) উপস্থিতিতে প্রথম একটা জনসভা হয়। সময়ের স্রোতধারায় ১৯৯১ সনে কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতা-কর্মীদের সাথে নিয়ে স্থানীয় জনগনের সহযোগীতায় তৎকালিন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আজকের বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী (নুরুল ইসলাম নাহিদ) এর নেতৃত্বে সোনাই নদীর তীর ঘেষে নানকার আন্দোলনের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়।
তারপর সময় আমাদের ঠেলে দেয় কোন্ অজানায়, আমরা কোন না কোনভাবে দেশ ছাড়ি। একঝাক তরুণ যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দেয়। রাজনীতিতে হয় নতুন মেরুকরণ। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের ভাঙ্গনের সুর বাজে বাংলাদেশেও। সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার অনেক নেতাই পূঁজিবাদ আর মুক্তবাজার অর্থনীতির হাওয়ায় নিজেকে পাল্টে নেন। স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির হাওয়ার সে জাপটা বিয়ানীবাজারেও অনেক কিছুই পাল্টে দেয়। থমকে যায় নানকার স্মৃতি সৌধের কাজও।
জ.
কিন্তু এরপরও ইতিহাসের গতিধারার অনিবার্যতাকে রুখতে পারে না কেউই। কেউ না কেউ এগিয়ে আসে। প্রগতির ঝান্ডা যারা উড্ডিন রাখতে চায়, তারা যে রাজনীতির আদর্শে বিশ্বাসী হোক না কেন, তারা আগায় । সেরকমই একটা সংগঠন বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড। সেই সংগঠনটির সার্বিক ব্যাবস্থাপনায় আজকের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় শেষ পর্যন্ত নানকার স্মৃতিসৌধ মাথা তোলে দাঁড়ায়। ইতিহাসের পাতায় নতুন সে অধ্যায় সূচিত হয় ২০০৯ সালে। কমিউনিস্ট পার্টির সাথে আরেকটা সংগঠনের নাম সংযুক্ত হয়, আর সেটা হলো বিয়ানীবাজার সাংস্কৃতিক কমান্ড।
আশির দশকের শেষের দিকের বিপ্লবে উন্মাতাল করা সেই দিনগুলো এখনও ভাবতে গেলে স্মৃতিকাতর হয়ে যাই আমরা। হয়ত পারিনি টিকে থাকতে, কিন্তু সেই দীক্ষাই আমদের প্রাণিত করে, পথ দেখায় আগামীর দিকে। আর সেজন্যেই শিকড় খুঁজতে যাওয়া বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই যখন যাই, তখন সেই সৌধটা আমাকে টানে। নানকার স্মৃতি সৌধের সামনে দাঁড়িয়ে সোনাই’র স্রোত দেখি, ভাবতে থাকি একদিন এই খরস্রোতা নদীর রক্তস্রোতই পাল্টে দিয়েছিলো সভ্যতার চাকা। সামন্তবাদের পতন ঘঠিয়েছিলো এ রক্তধারা, বর্বর জমিদারদের অত্যাচার-নির্যাতন-যৌনতা তথা শোষনের প্রাথমিক জাতাকল ভেঙ্গেছিল এ লাল রক্ত।
সোনাই নদীর সে স্রোত এখন নেই। ধীরে চলা সোনাই’র জলের মতোই এই সভ্যতায় যেন আটকে গেছে শৃংখল ভাঙ্গার শপথ। স্বপ্ন দেখি, অজয় ভট্টাচার্যদের মতে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে, কোটি কোটি জনতার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গড়বে একটা সুন্দর উজ্জল বাংলাদেশ।

ফারুক যোশী; কলামিস্ট, প্রধান সম্পাদক; ৫২বাংলা টিভি ডটকম।