দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশের ভিসা কার্যক্রম বন্ধ
- আপডেট সময় : ১২:১৯:০৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 92
ভারতের দিল্লি ও আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন থেকে ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং ত্রিপুরার আগরতলায় সহকারী হাই কমিশনের সামনে এ সংক্রান্ত নোটিস টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানান।
দিল্লিতে বাংলাদেশ ভবনের সামনে হট্টগোল ও হুমকির অভিযোগ ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং উত্তেজনার মধ্যেই সাময়িকভাবে ভিসা কার্যক্রম বন্ধের এ সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া গেল।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভ ও বিক্ষোভের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকায় দুটি পত্রিকা অফিস ও ছায়ানট ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই রাতেই চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে একদল মানুষ বিক্ষোভ করে এবং সে সময় মিশনের দিকে ঢিল নিক্ষেপ করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের (আইভ্যাক) কার্যক্রম রোববার থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
এদিকে, বৃহস্পতিবার রাতেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ভালুকার একটি কারখানার শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৮) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন দেওয়া হয়।
এরপর শনিবার রাতে দিল্লিতে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’ নামের একটি সংগঠনের ২০–২৫ জন সদস্য বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং বাংলাদেশের হাই কমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেন।
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার মো. ফয়সাল মাহমুদকে উদ্ধৃত করে রোববার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, “বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে কিছু কথাবার্তা (তারা) বলছে- হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে; হাই কমিশনারকে ধরো। পরে তারা মেইন গেটের সামনে এসে কিছুক্ষণ চিৎকার করে। ওরা চিৎকার করে চলে গেছে- এতটুকুই আমি জানি।”
এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাণধীর জয়সওয়াল রোববার এক বিবৃতিতে বলেন, “বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা আমরা দেখেছি। সত্যটা হচ্ছে, ২০ ডিসেম্বর ২০-২৫ জন যুবক নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে জড়ো হয়ে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়েছে এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছে।
“নিরাপত্তা বেষ্টনী লঙ্ঘন কিংবা নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির মত কোনো প্রচেষ্টা সেখানে ছিল না।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “কয়েক মিনিট পরই ওই দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এই ঘটনার ভিডিও প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে।”
রাণধীর জয়সওয়াল আরও বলেন, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বিদেশি মিশন ও কার্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির দিকে ভারত নজর রাখছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগে রাখছেন আমাদের কর্মকর্তারা। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে আমাদের জোরালো উদ্বেগ জানানো হয়েছে। আমরাও দীপু দাসের বর্বর হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি।”
ভারতের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন রোববার সাংবাদিকদের বলেন, দিল্লিতে কূটনৈতিক এলাকার গভীরে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সামনে ‘হিন্দু চরমপন্থি সংগঠনের বিক্ষোভকারীদের আসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে’।
তিনি বলেন, “ভারতীয় প্রেসনোটে যে কথা বলা হয়েছে, এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করি এজন্য যে, বিষয়টি যত সহজভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, আসলে অত সহজ না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের মিশন, বাংলাদেশের মিশন কূটনৈতিক এলাকার গভীরে অবস্থিত। এমন না যে এটা বাইরে কোনো জায়গায় অথবা কূটনৈতিক এলাকার শুরুতে, তা কিন্তু না। তারা বলছে ২০-২৫ জনের একটা দল, হতে পারে। হয়ত একটু কম বেশি হতেও পারে সংখ্যাটা। কিন্তু সেটা কথা না।
“একটা হিন্দু চরমপন্থি সংগঠনের ২৫ বা ৩০ জনের একটা দল এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন, একটা স্যানিটাইজড এলাকার মধ্যে? তার মানে তাদেরকে আসতে দেওয়া হয়েছে তাইলে। যেভাবে হোক তারা এসেছে, আসতে পারার কথা না কিন্তু নরমালি।”
তৌহিদ হোসেন বলেন, “সেখানে তারা দাঁড়িয়ে যে শুধু ওই হিন্দু নাগরিকের হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে চলে গেছে, তা না। তারা আরো অনেক কিছু বলেছে, সেটা আমরা জানি। এবং আমাদের পত্রপত্রিকায় যে রিপোর্টটা আসছে, সেটাকে যে তারা বলতেছে যে ‘মিসলেডিং’, এটাও সত্য না।
“আমাদের পত্রপত্রিকায় মোটামুটি সঠিক রিপোর্টই এসেছে, যেটুকু আমরা তথ্য পেয়েছি। আমার কাছে প্রমাণ নেই যে তাকে (হাই কমিশনার) হত্যার হুমকি দিয়েছে, কিন্তু আমরা এটাও শুনেছি যে, তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেটা কেউ একজন কথা বলল, সেটার মধ্যে হতে পারে।”
কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে বিক্ষোভকারীরা কীভাবে প্রবেশ করল—সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “সাধারণত কোনো প্রটেস্ট গ্রুপ যখন যায়, সেটা আগে থেকে ইনফর্ম করা হয় এবং পুলিশ তাদেরকে একটু দূরে এক জায়গাতে আটকে দেয়। কখনও যদি কোনো কাগজপত্র দেওয়ার থাকে, দুইজন এসে দিয়ে যায়। এটা হলো নর্ম। সবখানে এটা হয়, আমাদের দেশেও হয়।”
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের মন্তব্য প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, “একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এটার সাথে মাইনরিটিজের নিরাপত্তাকে একসাথে করে ফেলার কোনো মানে হয় না। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক, যাকে হত্যা করা হয়েছে এবং অবিলম্বে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে অ্যাকশন নিয়েছে। ইতোমধ্যে আপনারা জানেন যে, বেশ কিছু অ্যারেস্ট করা হয়েছে।
“তো, এ ধরনের ঘটনা যে শুধু বাংলাদেশে ঘটে তা নয়, এই অঞ্চলের সব দেশেই ঘটে। এবং প্রত্যেক দেশের দায়িত্ব হচ্ছে, সেক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া, বাংলাদেশ নিচ্ছে। অন্যদেরও উচিত সে রকম ব্যবস্থা নেওয়া। কাজেই এটা গ্রহণযোগ্য না, যেভাবে এটাকে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
বাংলাদেশ হাই কমিশন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে পালিত হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা মনে করি যে, নরমালি সিকিউরিটির যে নিয়ম কানুন আছে, সেটা এখানে ঠিকমত পালিত হয়নি। তারা বলছে যে, আমাদের সব মিশনের নিরাপত্তা দেখছে, আমরা সেটা নোট করেছি।”
কর্মরত কূটনীতিবিদদের নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ মিশন সংকুচিত করার বিষয়টি সরকার ভাবছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “যদি তেমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে আমরা সেটা করব। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা যেটা দেখছি, আমরা এখনো ভরসা রাখছি, ভারত যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে।”
দিল্লি মিশনে কর্মরত অবস্থার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তৌহিদ হোসেন বলেন, “ব্যাপারটা কিন্তু শুধু যে তারা এখানে এসছে, দুটো স্লোগান দিয়েছে তা না। এর ভেতরে কিন্তু একটা পরিবার বাস করে; হাই কমিশনার এবং তার পরিবার কিন্তু ওখানে বাস করে।
“তারা কিন্তু থ্রেটেনড ফিল করেছে। এবং তারা কিন্তু আতঙ্কিত হয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। দুইজন গার্ড ছিল, তারা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।”



















