ঢাকা ০২:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণভোট নিয়ে যত প্রশ্ন

৫২ বাংলা
  • আপডেট সময় : ১১:৩৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 18
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আসন্ন গণভোটকে সামনে রেখে চারটি পয়েন্টে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার প্রচারণা জোরালো হলেও, এই চারটি পয়েন্টের ভেতরে ঠিক কী রয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোটে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—সে বিষয়ে জনমনে এখনো স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। একদিকে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ধরনের প্রচারণা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজের বক্তব্য—নির্বাচনের পর সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদের মতো কাজ করবে—নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি এই সরকারই আরও ১৮০ দিন দায়িত্বে থাকবে? সব মিলিয়ে গণভোট ঘিরে কৌতূহল, সংশয় ও বিতর্ক বাড়ছে।

এরই মধ্যে ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ প্রশ্ন তুলেছেন, জুলাই সনদের ৮৪টি বিষয় জনগণের কাছে আদৌ পরিষ্কার কি না। এই প্রশ্নের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা আরও তীব্র হয়। চারটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের কথা বলা হলেও, সেই চারটির ভেতরে থাকা ৮৪টি বিষয় কীভাবে এল—এবং সেগুলোর বিস্তারিত কী—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন আলাদা গোলাপি রঙের ব্যালটে ভোটাররা ভোট দেবেন, যেখানে সংক্ষেপে মাত্র চারটি বিষয় লেখা থাকবে। সমালোচকদের মতে, এই চারটির ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণাই বেশি হচ্ছে।

কীভাবে খুলবে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর দরজা

গণভোটের প্রচারণায় শুরু থেকেই বলা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে না। কয়েক দিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশ বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।

তবে জনগণের প্রশ্ন—এই দরজা খুলবে কীভাবে? সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জুলাই সনদের মূল দর্শন হলো কোথাও একচ্ছত্র ক্ষমতা যেন না থাকে। উদাহরণ হিসেবে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও ‘হ্যাঁ’ ভোটে জুলাই সনদ পাস হলে ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এ দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসবে। কোনো সার্চ কমিটি বা প্রধানমন্ত্রীর একক নিয়োগ থাকবে না। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। সংসদকে প্রাণবন্ত করতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুই দল থেকেই নির্বাচিত হবেন।

পরিচয় ও মূলনীতির পরিবর্তন

জুলাই সনদে দীর্ঘদিনের বাঙালি ও বাংলাদেশি পরিচয় বিতর্কের কথাও রয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এ বিষয়ে সমাধানের পথ রাখা হয়েছে। এতদিন নাগরিক পরিচয় ছিল বাঙালি, সংস্কারের পর তা হবে বাংলাদেশি। বর্তমানে সংবিধানের মূলনীতি—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে নতুন মূলনীতি হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।

এই বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করে না তুলে কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানানো নিয়ে প্রশ্ন তুললে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মনিরা শারমিন বলেন, জুলাই সনদে কী আছে ও কী পরিবর্তন আসবে—এসব বিষয় অবশ্যই জনগণকে বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল। তবে প্রচারণার সময় তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন।

কেন বলা হচ্ছে ‘ফ্যাসিস্ট ফিরবে না’

সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘ফ্যাসিস্ট ফিরবে না’ কথাটি কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে নয়। জুলাই সনদের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো দল বা ব্যক্তি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকবে না—এই অর্থেই কথাটি বলা হচ্ছে।

‘হ্যাঁ’ ভোটে কী পরিবর্তন আসবে

জুলাই সনদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারিতে প্রধানমন্ত্রীর একক স্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং সেখানে বিরোধী দলীয় নেতা বা উপনেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রেও এক কক্ষ নয়, দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে।

সরকারি প্রচারণা ও সরকারি কর্মকর্তা

শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—সরকার ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারে কি না। ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকার আইনগতভাবে প্রচারণা চালাতে পারে। তবে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশন জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তারা করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হবে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকার পারলে সরকারি কর্মকর্তারা পারবেন না কেন।

১৮০ দিনের গণপরিষদ প্রসঙ্গ

২৮ জানুয়ারি এক গোলটেবিল আলোচনায় আলী রিয়াজ বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিচালনার পাশাপাশি ১৮০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়লে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। পরে প্রেস উইং বিষয়টিকে ভিত্তিহীন দাবি বলে জানায়। আলী রিয়াজ ব্যাখ্যা করেন, সংসদ স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাবে; তবে মৌলিক সংস্কারের জন্য সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করবেন।

প্রশ্ন তোলা কি অপরাধ

গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুললেই অনেক সময় সেটিকে বিরোধিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদে কী আছে তা জানার অধিকার সবার রয়েছে। আসিফ সালেহ লিখেছেন, গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই বৈধ, যখন তা বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। না বুঝিয়ে সম্মতি আদায় প্রকৃত সম্মতি নয়। তাই গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা পরিবর্তনবিরোধিতা নয়।

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষারও বলেন, জুলাই সনদে কী আছে এবং কী পরিবর্তন ভাবা হয়েছে—এসব আলাদা করে জনগণকে জানানো দরকার ছিল। তাঁর প্রশ্ন—যদি জনগণ ‘না’ ভোট দেয়, তখন কী হবে? শেষ পর্যন্ত জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

আনোয়ারুল ইসলাম অভি

সম্পাদক; ৫২বাংলাটিভি ডটকম
ট্যাগস :

গণভোট নিয়ে যত প্রশ্ন

আপডেট সময় : ১১:৩৯:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন গণভোটকে সামনে রেখে চারটি পয়েন্টে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার প্রচারণা জোরালো হলেও, এই চারটি পয়েন্টের ভেতরে ঠিক কী রয়েছে এবং ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোটে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—সে বিষয়ে জনমনে এখনো স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। একদিকে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ ধরনের প্রচারণা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজের বক্তব্য—নির্বাচনের পর সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদের মতো কাজ করবে—নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি এই সরকারই আরও ১৮০ দিন দায়িত্বে থাকবে? সব মিলিয়ে গণভোট ঘিরে কৌতূহল, সংশয় ও বিতর্ক বাড়ছে।

এরই মধ্যে ব্র্যাকের প্রধান নির্বাহী আসিফ সালেহ প্রশ্ন তুলেছেন, জুলাই সনদের ৮৪টি বিষয় জনগণের কাছে আদৌ পরিষ্কার কি না। এই প্রশ্নের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা আরও তীব্র হয়। চারটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের কথা বলা হলেও, সেই চারটির ভেতরে থাকা ৮৪টি বিষয় কীভাবে এল—এবং সেগুলোর বিস্তারিত কী—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন আলাদা গোলাপি রঙের ব্যালটে ভোটাররা ভোট দেবেন, যেখানে সংক্ষেপে মাত্র চারটি বিষয় লেখা থাকবে। সমালোচকদের মতে, এই চারটির ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণাই বেশি হচ্ছে।

কীভাবে খুলবে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর দরজা

গণভোটের প্রচারণায় শুরু থেকেই বলা হচ্ছে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে না। কয়েক দিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে দেশ বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে এবং নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে যাবে।

তবে জনগণের প্রশ্ন—এই দরজা খুলবে কীভাবে? সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জুলাই সনদের মূল দর্শন হলো কোথাও একচ্ছত্র ক্ষমতা যেন না থাকে। উদাহরণ হিসেবে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও ‘হ্যাঁ’ ভোটে জুলাই সনদ পাস হলে ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এ দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসবে। কোনো সার্চ কমিটি বা প্রধানমন্ত্রীর একক নিয়োগ থাকবে না। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। সংসদকে প্রাণবন্ত করতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুই দল থেকেই নির্বাচিত হবেন।

পরিচয় ও মূলনীতির পরিবর্তন

জুলাই সনদে দীর্ঘদিনের বাঙালি ও বাংলাদেশি পরিচয় বিতর্কের কথাও রয়েছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এ বিষয়ে সমাধানের পথ রাখা হয়েছে। এতদিন নাগরিক পরিচয় ছিল বাঙালি, সংস্কারের পর তা হবে বাংলাদেশি। বর্তমানে সংবিধানের মূলনীতি—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে নতুন মূলনীতি হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।

এই বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করে না তুলে কেবল ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানানো নিয়ে প্রশ্ন তুললে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মনিরা শারমিন বলেন, জুলাই সনদে কী আছে ও কী পরিবর্তন আসবে—এসব বিষয় অবশ্যই জনগণকে বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল। তবে প্রচারণার সময় তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন।

কেন বলা হচ্ছে ‘ফ্যাসিস্ট ফিরবে না’

সংশ্লিষ্টদের মতে, ‘ফ্যাসিস্ট ফিরবে না’ কথাটি কোনো নির্দিষ্ট দলের বিরুদ্ধে নয়। জুলাই সনদের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো দল বা ব্যক্তি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকবে না—এই অর্থেই কথাটি বলা হচ্ছে।

‘হ্যাঁ’ ভোটে কী পরিবর্তন আসবে

জুলাই সনদ অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারিতে প্রধানমন্ত্রীর একক স্বাক্ষরের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং সেখানে বিরোধী দলীয় নেতা বা উপনেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রেও এক কক্ষ নয়, দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে।

সরকারি প্রচারণা ও সরকারি কর্মকর্তা

শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে—সরকার ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে পারে কি না। ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সরকার আইনগতভাবে প্রচারণা চালাতে পারে। তবে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশন জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো পক্ষের হয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তারা করলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ হবে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকার পারলে সরকারি কর্মকর্তারা পারবেন না কেন।

১৮০ দিনের গণপরিষদ প্রসঙ্গ

২৮ জানুয়ারি এক গোলটেবিল আলোচনায় আলী রিয়াজ বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিচালনার পাশাপাশি ১৮০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়লে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। পরে প্রেস উইং বিষয়টিকে ভিত্তিহীন দাবি বলে জানায়। আলী রিয়াজ ব্যাখ্যা করেন, সংসদ স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাবে; তবে মৌলিক সংস্কারের জন্য সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করবেন।

প্রশ্ন তোলা কি অপরাধ

গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুললেই অনেক সময় সেটিকে বিরোধিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদে কী আছে তা জানার অধিকার সবার রয়েছে। আসিফ সালেহ লিখেছেন, গণতন্ত্রে সম্মতি তখনই বৈধ, যখন তা বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। না বুঝিয়ে সম্মতি আদায় প্রকৃত সম্মতি নয়। তাই গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলা পরিবর্তনবিরোধিতা নয়।

গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষারও বলেন, জুলাই সনদে কী আছে এবং কী পরিবর্তন ভাবা হয়েছে—এসব আলাদা করে জনগণকে জানানো দরকার ছিল। তাঁর প্রশ্ন—যদি জনগণ ‘না’ ভোট দেয়, তখন কী হবে? শেষ পর্যন্ত জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।