প্রায় ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনার পর কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ বৈঠক। গত ৫০ বছরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা।
কিন্তু রোববার (১২ এপ্রিল) সকালে কোনো চুক্তি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার ঘোষণা দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আলোচনা ভেস্তে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ‘খারাপ খবর’।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ও ট্রাম্পের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র খুবই সরল এবং চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয় ইরান সেটি গ্রহণ করে কিনা।
ভ্যান্স আরও জানান, ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই আলোচনায় তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন।
তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে আগেই কিছুটা উদাসীন মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন।
মায়ামিতে একটি কুস্তি প্রতিযোগিতায় (ইউএফসি) যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, “ইরানের সঙ্গে চুক্তি হল কিনা, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে আলোচনায় ব্যস্ত থাকার সময়টিতে ট্রাম্প কুস্তি দেখে কাটিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
মতবিরোধের মূল কারণ
আলোচনায় মতবিরোধ দেখা দেয় মূলত দুটি ইস্যুতে—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর।
এই দুটি বিষয়ে মতানৈক্যই একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একে অপরকে দোষারোপ
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স।
তিনি বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ে ইরানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি’ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইরান শর্ত মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে এবং এমন কোনো সক্ষমতা অর্জন না করে যা দ্রুত তাদের পারমাণবিক শক্তিধর করে তুলতে পারে—এখন না, ভবিষ্যতেও না।
অন্যদিকে, ইরান আলোচনা ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
তাসনিম নিউজ জানায়, তেহরানের মতে এখন ‘বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে’।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই ঠিক করতে হবে তারা ইরানের আস্থা অর্জন করতে চায় কি না।
ইরানের অবস্থান ও বক্তব্য
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ‘যৌক্তিক প্রস্তাব’ দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কালিবাফ লিখেছেন,
“আমাদের সদিচ্ছা ছিল, কিন্তু আগের দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের প্রতিপক্ষের ওপর বিশ্বাস নেই।
আর অপর পক্ষও (যুক্তরাষ্ট্র) এই দফা আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জন করতে পারেনি।”
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, কয়েক সপ্তাহের সংঘাত ও গভীর অবিশ্বাসের পর এক দফা আলোচনায় সব সমাধান হবে—এমন ধারণা অবাস্তব।
তিনি জানান, কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হলেও দুই-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনও বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে।
‘কূটনীতি কখনও শেষ হয় না’
বাঘাই বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিকতা, আস্থা ও ইরানের অধিকার স্বীকৃতির ওপর।
শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা শেষ হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন,
“কূটনীতি কখনও শেষ হয় না।”
তিনি আরও জানান, পাকিস্তানসহ বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
আঞ্চলিক ইস্যু ও জটিলতা
ইরান আগে থেকেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, জব্দকৃত অর্থ ফেরত, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে আসছিল।
বিশেষ করে ইসরায়েলের লেবাননে হামলা বন্ধের প্রশ্নে ইরান অনড় ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—লেবানন ইস্যু আলোচনার অংশ নয়।
আরও আলোচনার আহ্বান
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার উভয়পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সংলাপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওংও পুনরায় আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এরপর কী? অনিশ্চয়তায় ভবিষ্যৎ
চুক্তি না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এখন প্রশ্ন—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার আলোচনায় বসবে, নাকি পরিস্থিতি আবার সংঘাতে গড়াবে?
যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ কী—এসব প্রশ্ন এখনো অনিশ্চিত।
তবে কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি—এমন ইঙ্গিত মিললেও পরবর্তী আলোচনার সময় ও স্থান এখনও নির্ধারিত হয়নি।
-
ট্রাভেল পাস নিতে গিয়ে না ফেরার দেশে প্রবাসী অরুণ
-
হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের পাশাপাশি ইরানে আবার হামলার চিন্তা ট্রাম্পের
-
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ২১ ঘণ্টার আলোচনা ব্যর্থ : খারাপ খবর! ইরানের সঙ্গে চুক্তি হয়নি: ভ্যান্স
-
রোমে সুরঙ্গ খুঁড়ে বাংলাদেশি দোকানে চুরি
-
কুয়েতে ইরানের হামলায় মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র?