বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
কারী ইন্ড্রাস্টির সংকট মোকাবেলায় দরকার সমন্বিত উদ্যোগ  » «   বিবিসি প্রকাশ করেছে উইঘুর নির্যাতন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য  » «   মাদ্রিদে বাংলাদেশ দূতাবাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপন  » «   মাঙ্কিপক্স সংক্রমণ আরও ২ দেশে: বেলজিয়ামে ২১ দিনের কোয়ারেন্টিন ঘোষণা  » «   শুধুই নারীদের পরিচালনায় প্রথম সৌদি আরবের আকাশে উড়ল ব্যতিক্রমী ফ্লাইট  » «   গোলাপগন্জে চেয়ারম্যান প্রার্থী এলিম চৌধুরী’র মতবিনিময়  » «   দুদকের মামলায় হাজী সেলিম কারাগারে  » «   নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ার মুদ্রা রুবল’র উত্থান  » «   কারী শিল্পের সংকট মোকাবেলায় সিবিআই প্রেসিডেন্টের কাছে  বিসিএ’র পাঁচ দাবী উপস্থাপন  » «   গোলাপগঞ্জে ভোটার হাল নাগাদ শুরু  » «   বার্সেলোনায় মাদারীপুর সমিতির ঈদ পুনর্মিলনী  » «   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসায় স্পেনের প্রেসিডেন্ট  » «   আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর চিরবিদায়  » «   ইতালির জেনোভায়‌ প্রবাসীদের কনস্যুলেট সেবা প্রদান  » «   বিয়ানীবাজার থানা জনকল্যাণ সমিতি ইউকে‘র দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত  » «  
সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন

ওমিক্রণ এবং ব্রিটেনের প্রশ্নবোধক স্বাস্থ্য সেবা



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

যারা ভ্যাকসিন সেবা দিচ্ছেন, যারা উপদেশ দিচ্ছেন, তাদের একটা বড় অংশ যদি এতে আস্থা না রাখেন, তাহলে এটা কোন্ ধরনের সেবা। তাই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এনএইচএস এর স্টাফদের নিজস্ব পছন্দের কারণে  কেন সরকার সমালোচিত হবে এবং জনগণের ট্যাক্সের অর্থে পরিচালিত স্বাস্থ্য খাত থেকে নাগরিক তার মৌলিক অধিকার থেকে কেন-ই বা বঞ্চিত হবে । আর একারনে এখন এনএইচ স্টাফদের প্রতি নাগরিকদের সেই ‘নায়কসুলভ’ প্রশংসা এখন সমালোচনার দিকেই আগাচ্ছে।

গত দু’বছর থেকে সারা পৃথিবীর পিছু ছাড়ছে না মহামারী। মহামারী করোনায় এ পৃথিবীর প্রায় সবাই-ই কোন না কোনভাবে থেকেছেনে শংকায়, ছিলেন আতংকগ্রস্থ। অধিকাংশ মানুষই কেউ না কেউ  হারিয়েছেন নিজস্ব কাছের মানুষ কিংবা স্বজন। কষ্টের পাথর ফেলে তবুও হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্বজনা ফিরে আসছেন আবারও জীবনের পথচলায়, স্বাভাবিকত্বে। আমি আমরা অনেকেই দেখেছি, বড় কাছাকাছি জীবনের এই সংকট সময়।

হাসপাতালে বসে আমিও আমার এক স্বজনের শেষ সময়ের প্রহর গুনেছি। নার্স এসে যখন বললেন, প্রচন্ড যুদ্ধ করেছেন তিনি, তাঁর সমস্থ শক্তি দিয়ে, কিন্তু একে একে শরীরের প্রতিটি অর্গানে করোনার কাঁটা বিদ্ধ করেছে তাঁকে জোরে, বড় জোরে।  যে কোন সময় তিনি হারিয়ে যাবেন চিরতরে। একজন মানুষের চলে যাওয়ার শেষ ক্ষণটুকু গুনছিলাম,আমরা তাঁর স্বজনরা । কেউ কারো দিকে তাকাই নি। চোখ থেকে বেরুচ্ছিল সকলের বেদনার বাষ্প, নিরব নিদারুন হাহাকারে।  তাঁর স্ত্রী বসেছিলেন পাশে, কোবিড আক্রান্ত রোগীদের কক্ষে, মেয়ে দু’জন দুটো চেয়ারে পাশাপাশি, সবাই ছিলেন কোন আশা ছাড়াই, বসেছিলেন শুধু শেষ নি:শ্বাসটুকু দেখার জন্য।কারণ নার্স-ডাক্তার তাঁদেরও সেই একই কথাই বলেছিলেন । তারপর যখন আমরা তাদের বেরিয়ে আসা দেখলাম, বুঝলাম একসময়ের জরজরে প্রচন্ড আড্ডাবাজ আশির দশকের প্রথম দিকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রানখোলা তরুণ, আমার অগ্রজ আলমগীর চৌধুরীকে আমরা আর ফিরে পাবো না। বুকফাটা আর্তনাদে তখন হাসপাতালের ভেতরের ওয়েটিং রুমে এক নিকষ কালো সময়, অন্তত তাঁদের জীবনের। কারন যাদের হারায়, শুধু তারাই জানে কি হারিয়েছে তারা।তবুও এইতো জীবন, এই তো জীবনের ছুটেচলা অনন্তের দিকে।

অথচ এ মানুষটা একজন প্রচন্ড স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ছিলেন। আমাকে সব সময় ফোন করে কি করতে হবে, তার একটা ফিরিস্তি দিতেন সময়ে সময়ে। আমাকে বলেছিলেন তোমিতো বোষ্টার নিয়েছো, আমিও নিচ্ছি আগামী সপ্তাহেই। ব্রিটেনে লকডাউন  শেষে এক বছরেরও অধিক সময় পর শুরু করেছিলেন তার অফিস যাত্রা, ম্যানচেষ্টারে। কিন্তু শেষপর্যন্ত মহামারী ডেল্টার কাছে তিনিও হারিয়ে গেলেন।

তিনি বলতেন,কি আবার আরেকটা এসেছে, ওমিক্রণ–সতর্ক থেকো । ওমিক্রণ তাঁকে কিছুই করে নি। হয়ত ওমিক্রণ খুব একটা কিছু করছেও না।তবুও ব্রিটেনে এখন ওমিক্রণ-ঝড় চলছে। এই ঝড়ে লাখো মানুষ প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে। গত সপ্তাহে এই আক্রান্তের সংখ্যা একদিনে দু’লাখ ছাড়িয়েছিলো। এখন কিছুটা কমলেও লাখের উপরেই আছে। কিন্তু তারপরও সরকারী পর্যায়ে ওমিক্রণকে মহামারী হিসেবে নেয়া হচ্ছে না, গেলো বছরের মত। প্রায় দু’সপ্তাহ আগে বন্ধ করা হয়েছে গণহারে পিসিআর টেস্ট। শরীরে কোবিডের বড় রকমের কোন কিছু অনুভূত না দেখলে হাসপাতাল কিংবা কোবিড টেস্ট সেন্টারে ভীড় এড়াতে এ উদ্যোগ নিল সরকার।

যেহেতু এ ভাইরাস আগের মত নেই, অর্থাৎ মৃত্যু ততটা নেই, সেহেতু ব্রিটনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চাপ কমাতেই এ উদ্যোগ। অন্যদিকে আতংক থেকে দেশটির জনগণকে দূরে রাখতে এ-ও একটা পদ্ধতি বটে। যুক্তরাজ্যের জনগণ ক্রমেই ওমিক্রণে র সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। প্রতিবছরের স্বাভাবিক কাশি-সর্দির ভাইরাসেরমেতই মেনে নিতে শিখছে ব্রিটিশ জনগণ।  মানুষ যাতে হাসপাতাল কিংবা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)কে চাপের মুখে না রাখে সেজন্য এসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু  স্বাস্থ্য বিভাগ তথা সরকারের পক্ষ থেকে আতংকিত না হতে প্রচার-প্রচারণা থাকলেও এ প্রচারণা দেশটির জনগণের কাছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্ঠি করেছে ।

কিন্তু এখানেও কথা আছে । এমনিতেই এনএইচএস নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে দেশটিতে । দেশটির গর্ব হিসেবে পরিচিত এ খাত । কিন্তু বিভিন্ন সার্ভিস নিয়ে প্রচুর সমালোচনার মুখে থাকে এ খাত । অনেক দিন রোগীদের আপেক্ষায় থাকতে হয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য । ‘দুর্ঘঠনা এবং জরুরী’ (এ এন্ড ই) বিভাগে থাকে দীর্ঘ লাইন। একটা উন্নত দেশের মানুষ তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনা মুখর থাকে । তবুও প্যান্ডামিক অর্থাৎ মহামারী আসার পর মানুষ এই সমালোচনা থেকে বেরিয়ে আসে । বরং স্বাস্থ্য সেবায় যারা কাজ করছেন, তাদের একটা আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

কিন্তু এবার সেই নরম অর্থাৎ সহানুভুতিপুর্ণ মনোবৃত্তিটুকু মানুষের নেই । কারন মহামারীর কথা বলে অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারটা আগের মতই আছে। নিজস্ব ডাক্তারদের কাছেও এপয়ন্টমেন্ট পেতে অনলাইনে কিংবা টেলিফোনে রীতিমত ইন্টারভিউ দিতে হয়।  ডাক্তার-নার্স মিলে হাজার হাজার কর্মচারী ওমিক্রণের নামে ছুটিতে । আর সরকার শুধু  ‘চাপ কমাও এনই্চএস বাাঁচাও’ জাতিয় শ্লোগান নিয়ে আসছে ।

অথচ দেখা যাচ্ছে দেশটির বর্তমান যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অর্থাৎ দেশটিতে প্যান্ডামিক ছাড়াই যে পরিস্থিতি ছিল ইতিপূর্বে, তার চেয়ে বর্তমান খুব একটা মারাত্নক কিছু নয় । এখন মৃত্যু ১৫০ থেকে ৩০০’র মধ্যে উঠানামা করছে । এবং দেখা যাচ্ছে  ষাটোর্ধ মানুষগুলোর শংকা বাড়াচ্ছে ওমিক্রণে।  এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ২০১৭’র শেষদিকে এবং ২০১৮’প্রথম দিকে   শীতকালীন সময়ে স্বাভাবিক ভাইরাসে দিনের মৃত্যু এরকম এসেছে। বিবিসি’র এক কলাম লেখক তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, সেসময়ও মৃত্যু এর বেশী ছিল না । আর সেজন্য এমনকি সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত বিবিসি প্রশ্ন রাখছে, যদি ২০১৭-১৮ এবং ২০২১-২২ এর যুক্তরাজ্যে নাগরিকদের উপর প্রকৃতির এই চাপ  প্রায় সমান থাকে, তাহলে কেন শুধু শুধু সরকার দায়ভার সরাতে নাগরিকদের তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত রাখছে । শীতকালীন সময়ে এরকম চাপ অস্বাভাবিক নয়।

তিনি তাঁর আলোচনায় আরও উল্লেখ করেছেন, গত এক দশক থেকেই এনইচএস স্বাস্থ্য সেবায় সমালোচিত হচ্ছে । কোন সময়েই সরকার এর কোন উত্তরণ ঘঠাতে পারে নি। কোবিড শুরু হবার পর থেকে সত্যিকার অর্থেও স্বাস্থ্য কর্মীরা যে ত্যাগটুকু করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশী রিলাক্স মুডে আছেন তাঁরা এখন, বিশেষত জিপি সার্ভিস অর্থাৎ নাগরিকদের নিজস্ব ডাক্তার সেবা । অন্যদিকে যারা স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করবে, যারা মানুষকে আশ্বস্থ করছে, তাদের একটা বড় অংশই বিশ্বাস করছে না ভ্যাকসিনের প্রতি । কিংস কলেজ হসপিটালের প্রধান ড: ক্লভ কেই বিবিসি কে বলেছেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশ ডাক্তার কিংবা নার্স কিংবা স্বাস্থ্য সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট অর্থাৎ প্রায় ১৪ হাজার কর্মকর্তারা এখনও ভ্যাকসিন নেন নি। এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকেই আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি, আক্রান্তদের একটা বড় অংশ হলো টিকা না নেয়া মানুষ এবং ওমিক্রণে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর অধিকাংশই টিকাবিহীন বয়সী মানুষ।

দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রী সাজিদ জাভেদ এক হাসপাতাল পরিদর্শনে গেলে সে হাসপাতালের এক কনসালটেন্ট ষ্টীভ জেইমস   রীতিমত ভ্যাকসিন না নেয়ার পক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর কাছে প্রচার চালিয়েছেন । তিনি সাজিদ জাভিদকে বলেছেন, মানুষের ভ্যাকসিন না নেয়ার আইনগত অধিকার থাকা প্রয়োজন । অথচ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হল কোবিড থেকে নিজেকে বাঁচানোর এবং অন্যকে রক্ষা করার আপাতত অন্যতম প্রধান মাধ্যম হল নিজেকে ভ্যকসিনেইটেড করা। সরকারও নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করছে।  এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সরকার থেকে বিশেষত এনএইচএস এর স্টাফদের ভ্যাকসিন নিতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। যারা ভ্যাকসিন সেবা দিচ্ছেন, যারা উপদেশ দিচ্ছেন, তাদের একটা বড় অংশ যদি এতে আস্থা না রাখেন, তাহলে এটা কোন্ ধরনের সেবা। তাই এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এনএইচএস এর স্টাফদের নিজস্ব পছন্দের কারণে  কেন সরকার সমালোচিত হবে এবং জনগণের ট্যাক্সের অর্থে পরিচালিত স্বাস্থ্য খাত থেকে নাগরিক তার মৌলিক অধিকার থেকে কেন-ই বা বঞ্চিত হবে । আর একারনে এখন এনএইচ স্টাফদের প্রতি নাগরিকদের সেই ‘নায়কসুলভ’ প্রশংসা এখন সমালোচনার দিকেই আগাচ্ছে।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক, প্রধান সম্পাদক; ৫২বাংলাটিভি ডটকম

আরও পড়ুন-

একজন লাল মিয়া এবং ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের অসমাপ্ত তথ্য


সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

"এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব " -সম্পাদক