বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
কেসি সলিসিটর্সের দশক পূর্তি উদযাপন  » «   বঙ্গবন্ধু স্কলারশিপ আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি  » «   লীলা নাগের স্মৃতি রক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোগ নেবে  » «   ফুসফুস-ক্যান্সার পরীক্ষার জন্য মাইল এন্ড লেজার সেন্টারে স্থাপন করা হচ্ছে বিশেষ ‘স্ক্রিনিং মেশিন’  » «   অলি-মিঠু-টিপু প্যানেলের পরিচিতি ও ইশতেহার ঘোষণা  » «   ২০ নভেম্বর লন্ডনের রয়েল রিজেন্সিতে ৫ম বেঙ্গলী ওয়েডিং ফেয়ার  » «   একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির যুক্তরাজ্য শাখা গঠিত  » «   টি আলী স্যার ফাউন্ডেশন সম্মাননা পেলেন সিলেটের ২৪গুণী শিক্ষক  » «   নওয়াগ্রাম প্রগতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফুল, ফল ও ঔষধি বৃক্ষরোপণ  » «   আলোকিত মানুষ শিক্ষক মো. সমছুল ইসলাম এর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী  » «   সিলেটের বিয়ানীবাজারে একটি পরিত্যক্ত কূপে তাজা গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত  » «   বাংলাদেশী কারী  ব্রিটেনের প্রবৃত্তি ও খাবার সংস্কৃতিতে অনন্য  অবদান রাখছে  » «   পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীবাদের প্রতিবন্ধকতা  » «   রিষি সুনাক এশিয়ান বংশদ্ভোত, কনজারভেটিভ এবং ধনীদের বন্ধু  » «   গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাব নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহবান  » «  
সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন


মলাটে পুত্র : আলোর যাত্রা শুভ হোক…



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

মানুষ যে জীবন পিছনে ফেলে আসে সেখানে আর ফিরে যেতে পারেনা। স্মৃতি নিয়েই পার করতে হয় বাকীটা জীবন।তবে এই পিছন পথে নতুন জীবনের খোঁজে যখন নিজের সন্তান পা ফেলে তখন কার না ভাল লাগে।
আজ সকালেই পুত্র সাদাফের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে। পড়বে বহু বছর আগে আমারই পঠিত রাষ্ট্র বিজ্ঞান নিয়ে।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘পুত্রের মধ্যে পিতা নিজেকেই উপলব্দি করে এবং সেই উপলব্দিতে আনন্দ’। এ আনন্দ নিজের জীবনের ফ্ল্যাসব্যাকে পুত্রের জীবন দেখার আনন্দ!
আমার রাষ্ট্র বিজ্ঞান পড়া ছিল বিয়ের পর প্রেমের মত। ভর্তির পর ভাল লাগতে শুরু করে। আর বিয়ের আগে প্রেমের মত অনেক প্রস্তুতি নিয়ে পুত্র তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিয় বিষয়ে পড়তে যাচ্ছে।
আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সাদাফ পড়বে লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স এন্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সে।
সোশাল সায়েন্সভুক্ত সাবজেক্টগুলো পড়ার জন্য লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স এন্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স ওয়ার্ল্ড রেংকিয়ে এখন দ্বিতীয় এবং ইউরোপে শীর্ষে।
বিশ্বজুড়ে আলো ছড়ানো এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় হলেও গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে এর ৭০% শিক্ষার্থীই বিদেশী। একারনেই বিশ্বের অসংখ্য সফল রাজনীতিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ এখানে পড়াশুনা করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এদের মধ্যে ৫৫ জন রাষ্ট্র প্রধান হলেও মাত্র ২ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বাকীরা ভিন দেশের।
বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত মাত্র ১২৫ বছরের পুরানো এই ইউনিভার্সিটির শ্লোগানই হচ্ছে- ‘Research for the world’। সমৃদ্ধি এবং আধুনিকতার সূচকে এলএসইর লাইব্রেরী পৃথিবীর সবচাইতে বড়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য এর সেলফের দৈর্ঘ্য ৫০ কিলোমিটারেরও বেশী!
আমাদের অঞ্চলের ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি ড. কেপি নারায়ণ ছিলেন এলএসইর ছাত্র। বাঙ্গালী জ্যোতি বসুও আইন পড়েছিলেন এখানে। আরেক বাঙ্গালী অমর্ত্য সেনও এখানে পড়িয়েছেন। আর আমাদের অতি নিজস্ব ড. ইউনুস মাঝে মাঝে আমন্ত্রিত হয়ে আসেন বক্তৃতা দিতে।
ভবিষ্যৎ বিলয়নিয়ার বানানোর ক্ষেত্রেও এটি ইউরোপে শীর্ষে এবং বিশ্বে প্রথম দশের একটি। আরো আছেন অসংখ্য নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী। এই দুই সেক্টরেও বিদেশীদের প্রাধান্য।
তবে এর সবই অন্যের গল্প। এক জনের সাফল্য আরেক জনের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয়না কখনো।
আমেরিকাতে দূর্নীতিতে জড়িয়ে এলএসই গ্র্যাজুয়েট এক মস্ত ব্যাংকারের জেলে যাবার কাহিনী এই কিছুদিন আগেও ব্রিটিশ পত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যের আলো তাকে আলোকিত করতে পারেনি।
পিতা হিসাবে আশংকটা এখানেই। চূড়ান্ত বিচারে যদি মানুষ না হয় তাহলে কী হবে এই পদ পদবী কিংবা ডিগ্রিতে! পৃথিবীতে স্যুট টাই পরা ডিগ্রীধারী ইডিয়ট, অমানুষ আর চুরেরত অভাব নেই! ‘মানুষ সবার ঘরেই জন্মায়, কিন্তু মনুষ্যত্ব সবার ঘরে জন্মায় না’।
দেশে বিদেশে বেগম পাড়া আর দূর্নীতি করে সম্পদের পাহাড়ে বসবাসকারীদের অনেকেইতো আমার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন! এদেরওতো বাবা মা আছেন এবং তারাও একদিন উল্লসিত হয়েছিলেন সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য। শুনেছি ত্রাণের টাকাও নাকি আমার অগ্রজদের কেউ কেউ খেয়ে ফেলেন! জানতে ইচ্ছে করে সেই সব বাবা মারা আজও কী উল্লসিত? প্রকৃত শিক্ষা এবং সার্টিফিকেট দুটো ভিন্ন জিনিস।
বহু কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে সাদাফ আজ এলএসইতে পা রাখছে। দেশের অন্যতম সেরা স্কুলে পড়ার জন্য গত ৭ বছর প্রতিদিন ভোরের সূর্য উদয়ের আগে বাসে করে ১৭ মাইল পাড়ি দিয়ে স্কুলে গেছে, সূর্য না দেখেই বিকালে একই পথে বাড়ী ফিরেছে। পথে মারিয়েছে বরফ, গায়ে মেখেছে স্নো। হোমওয়ার্ক শেষ করে রাতে ঘুমাতে গেছে ১২টা ১টায়! এরই ফাঁকে ‘ডিউক অব এডিনবরায় অংশ নিয়েছে (তরুণদের কনফিডেন্স বাড়ানোর জন্য রাণীর সদ্য প্রয়াত স্বামীর বিশেষ প্রজেক্ট), আন্তঃস্কুল পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দেশ সেরাদের একজন হয়েছে, ইউরোপীয়ান ইয়ুথ পার্লামেন্টে ব্রিটেনকে প্রতিনিধিত্ব করেছে, ভলান্টারী পুলিশ ক্যাডেট হিসাবে কাজ করেছে এসেক্স পুলিশে, রুশনারা আলী এমপির সহযোগিতায় হাউজ অব কমন্সে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েছে। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা তার ভর্তিতে সহযোগিতা করেছে।
এজন্য আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে অনেক সময় এবং শ্রম দিতে হয়েছে। আর্থিক, মানসিক এবং শারীরিক সামর্থ্য বিবেচনায় অনেক কষ্টের ৭টি বছরের আজ অবসান হলো!
আজ থেকে সাদাফের জীবনের গল্প এগুতে থাকবে ভিন্ন স্রোতে- ওর মতো করে। পথিকের দলে মিশে গিয়ে তাকেই খুঁজে নিতে হবে বাকী পথ এবং গন্তব্য। তার সাথে অনেকেই হাঁটবে, তার জন্য হাঁটবে না কেউ। আমরাও না। এটাই জীবন।
এলএসইতে একজন বিদেশী শিক্ষার্থীকে পড়তে হলে মেধার মানদন্ড পার হওয়া সত্ত্বেও বছরে সবমিলিয়ে গুনতে হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার পাউন্ড। তবে ব্রিটিশ স্টুডেন্টদের এই ব্যয় প্রায় অর্ধেক এবং পিতামাতার সামর্থ্য না থাকলে তারা লোন নিয়ে পড়তে পারে। কর্মজীবনের আয় থেকে মাসে মাসে এই লোন পরিশোধ করতে হয়।
এলএসইতে এবছর ২৮টি সাবজেক্টে ইংল্যান্ডসহ সারা বিশ্বের ২১ হাজার আবেদনকারীর মধ্যে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে ১৬শ জন। বাংলাদেশ থেকে সাদাফকে এলএসইতে পড়ানো আমার পক্ষে কখনো সম্ভব হতো না। স্বপ্নেও না।
মানুষ তার কল্যানের জন্য সোশাল কন্ট্রাক্ট বা সামাজিক চুক্তির ভিত্তিতে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছিল। সাদাফের রাষ্ট্রের মতো আমার রাষ্ট্রে এই চুক্তি কাজ করেনি। ফলে কল্যানময়ী হয়ে সে আমার পাশে ছিল না। সাদাফের শৈশবের সাথে আমার শৈশব মিলাতে গেলে তাই আতঁকে উঠি। একটা অবৈজ্ঞানিক এবং নিষ্ঠুর জীবন আমার এবং আমাদের অনেকের শৈশবকেই গিলে খেয়েছে। কবরের আজাব, দোযখের ভয়াবহ বর্ণনা মক্তব, মসজিদ আর শিক্ষা বঞ্চিত গ্রামীন মোল্লাদের ওয়াজ থেকে শুনে শুনে আতঁকে উঠেছি বহুবার। খোদাতালার সাথে প্রথম পরিচয় ঘটেছে ভয়ংকর শাস্তিদাতা হিসাবে! নানা জাতের মশল্লার মত সাথে ছিল জ্বীন ভূতের আতংক আর নানা কুসংস্কার। স্কুলে ছিল বেত্রাঘাতের ভয় আর ছিল মাত্রাতিরিক্ত পারিবারিক শাসন! কচি মস্তিষ্কে যুক্তি যখন প্রবল থাকেনা তখন অন্যের মুখের ভাষা সরল এবং রঙ্গিন না হয়ে মনের মধ্যে ঢুকেছে আতংক আর সংযমের নামে নানা বিকৃতি! আদর্শের পরিবর্তে শাসনের দন্ড! চাইল্ড সাইকোলজি মতে বেশীরভাগই ছিল দন্ডনীয় অপরাধ। ফলে সাদাফ তথা ব্রিটিশ শিশুদের মতো জীবনের শুরুটা ডর ভয়হীন আনন্দময় ছিল না। এক ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানসিক পঙ্গুত্ব নিয়ে বন্ধনহীন জগতের জীবন যাত্রায় আমাদের অনেকেরই অভিষেক হয়েছিল।
উচ্চ শিক্ষায়ও ছিল গলদ আর পদ্ধতিগত ভুলে ভরা। মুখস্ত, ফটোকপি, নোট, প্রাইভেট টিউশনি, স্বজনপ্রীতি, নকল, জ্বালাও পুড়াও, ভাংঙ্গ – আরো কতকিছু। হলে ছিল সিট দখল, মারামারি-কাটাকাটি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর ভয়াবহতম অপুষ্টিকর খাবার। সব মিলিয়ে যা হবার তাই হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও এখন আর শুদ্ধ করে নিজের মাতৃভাষাটা পযর্ন্ত বলতে পারেন না। আমাদের কোথাও কোন স্বীকৃতি নেই। প্রাকৃতিকভাবে অতি মেধাবী হাতেগুনা কজন ছাড়া বেশিরভাগের অবস্থাই করুন। দেশে কিংবা বিদেশে। আমরা সৃষ্টিতেও নেই, নেই কোন দুঃসাহসিক অভিযানে। ‘আলহামদুলিল্লাহ করোনার দ্বিতীয় ভেকসিন নিলাম’ এনিয়েই আমরা সন্তুষ্ঠ। আমরা ভেকসিন দিতে গিয়ে সুন্নাতে খৎনার মতো মাননীয়ের উলঙ্গ বগলের গন্ধ নিতে আছড়ে পড়ছি সদল বলে। সম্প্রতি আরেক মাননীয় বাজেট ঘোষনা করে জানিয়েই দিয়েছেন আমাদের নাকি এখন বিদেশীদের ঋণ দেয়ার সময় হয়ে গেছে!! অশ্লীলতা আর উন্মাদনাকে আমরা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছি। আমরা অতলে যাচ্ছি প্রতিদিন।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সম্প্রতি এক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের মতোই নীচে নামছে আমাদের শিক্ষার মান’। বাংলাদেশের সরকারের কর্মকর্তাদের সাথে কাজের সরাসরি কিছু অভিজ্ঞতা থেকে কোন ধরনের দ্বিধা না করেই আমি বলবো -সামগ্রিক অবস্থা আসলেই মর্মান্তিক, ভয়াবহ এবং বিভৎস। মাননীয়দের অবস্থাতো আরো ভয়াবহ এবং করুন। সমগ্র বাংলাদেশেই আজ এক চিত্র। ব্রিটিশ মূলধারায় কাজ করতে এসে আবিষ্কার করেছি আমি নিজেও কতটা মর্মান্তিক। আমাদের এখন প্রতিদিনই ১৪ ডিসেম্বর!
রাষ্ট্র পাশে না থাকায় অভাব অনটনও আমাদের শৈশব গিলে খেয়েছে।
স্কুলে আমার এক ক্লাস উপরে পড়তো সমবয়সী চাচাত ভাই মুনির। বাপ চাচার কারসাজিতে তার পুরানো বই দিয়ে প্রতি বছর আমার নতুন ক্লাসে অভিষেক হতো। জগদীশপুর বাজারের বইয়ের দোকান থেকে এথ্রি সাইজের বিদেশী রঙ্গিন ম্যাগাজিন কিনে সেই পুরাতন বইয়ে মলাট লাগিয়ে নতুনের ছোঁয়া দিতাম। খুব মনে পড়ছে একবার বিদেশী নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি দিয়ে সাজানো একটি ম্যাগাজিন দিয়ে বইয়ের মলাট লাগিয়েছিলাম। অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, এলএসই, হার্ভাড, এমআইটি! ছবির দিকে তাকিয়ে কিভাবে সম্ভব না ভেবেই স্বপ্ন দেখেছিলাম বড় হয়ে আমিও একদিন…। এলোমেলো, জোড়াতালির এই জীবনে এ আশা পূর্ন হয়নি।
বাবা মা সন্তানের কাছে হারতে ভালবাসেন। সাদাফের কাছে আমি হেরেছি। মলাটের ছবি জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে পুত্রের জীবনে, আমারই পড়া বিষয়ে। এ আমার গর্ব নয়, আনন্দ এবং একান্তই ব্যক্তিগত। জীবনের গল্প সবার সমান নয়। একারনে আনন্দও সমান নয়। আবারো রবীন্দ্রনাথ থেকে ধার করে বলবো, ‘ছেলের অর্জনের কারনে পিতামাতার যে আনন্দ তা তার অর্জনের কারনে নয়, ছেলে যথার্থ আমারই বলিয়া’।
জীবন অবিচলিত এবং নিশ্চিত নয়। স্ব স্ব অবস্থানে এখানে লড়াই করেই বাঁচতে হয়। বিলাতে জন্ম নেয়াদের চাকুরী আর জীবনধারনের অর্থের জন্য চিন্তা করতে হয় না। এখানে লড়াইটা ভিন্ন। বিশেষ করে ইমিগ্র্যান্টদের জন্য। বর্ণবাদ, দুই সংস্কৃতির সাথে ভারসাম্য রক্ষা, শিকড়কে ধরে রেখে ব্রিটিশ সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করা, সীমিত গন্ডিতে জীবন সঙ্গী খুঁজে নেয়া আরো কত কিছু।
জীবনে কষ্ট পায়না এমন মানুষ নেই। বিস্তৃত সংসারের বিপুল ভারে সাদাফকেও কষ্ট পেতে হবে। সংক্ষিপ্ত এই জীবনে সাদাফ ভুল করবে, বাঁধা পাবে, হেরে যাবে, চোখের পানি ফেলবে। কখনো কখনো ভাগ্য প্রতারনা করবে। জীবন এবং কর্মে মোকাবেলা করতে হবে নতুন চ্যালেঞ্জ, নিতে হবে কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আত্ম পরিচয়ের। এখানে এই সংকটের কারনে অনেকেই ধর্মকে যেমন তীব্রভাবে সামনে এনে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন, তেমনি তালগোল পাকান অতিমাত্রায় বৃটিশ হতে গিয়েও। আসলে কোনটাই কাজ করে না। ব্রিটিশনেসের অভাব ছিল না রাজবধূ ম্যাগান মার্কেলের। দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। মানুষ ধর্ম পরিবর্তন করতে পারে, পাসপোর্ট পরিবর্তন করতে পারে, পারে না তার উৎস বা এথনিসিটি। এটাই সত্য। ব্যালেন্সটাই জরুরী। সাথে স্বচ্ছতাও।
খুব মনে পড়ছে রাষ্ট্র বিজ্ঞান ক্লাসেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি পড়াতে গিয়ে আমাদের সরদার ফজলুল করিম স্যার ফরাসী দার্শনিক রুশোর ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বুঝিয়েছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রুশোর দর্শনের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। রুশো বলেছিলেন ‘Man is born free but everywhere is in chain’ মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মালেও সর্বত্র সে শৃংখলিত। এই শৃংখল নানা ভাবে দেশে দেশে আজও সক্রিয়।
সাদাফের গায়ে হবিগঞ্জের চারাভাঙ্গা গ্রামের কাঁদা কিংবা মলিন ধূলাবালি হয়তো নেই, আছে রক্ত। কোন একদিন, আমার না থাকার দিনে আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে যখন কিছু একটা খুঁজবে তখনই উৎস সন্ধানের ব্যাকুলতা তাকে ঘিরে ধরবে। যতবেশী মানুষ হবে ততই সেই রক্ত তাড়া করবে!
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলে পথের সন্ধান মিলে না, আলোর কাছে যেতে হয়।
আমার জগদীশপুর যোগেশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের গেটে ছোট করে এলাকার অনাগত সন্তানদের জন্য লেখা ছিল অনেক বড় একটি কথা – ‘বিদ্যার জন্য প্রবেশ কর, জ্ঞানের জন্য বাহির হও’ (বাক্যটি সম্ভবত এখনো আছে)।
আমার স্কুল শিক্ষকদের মতো আমিও বিশ্বাস করি একমাত্র সঠিক জ্ঞান চর্চ্চাই পারে মানুষকে সর্বক্ষেত্রে মুক্তি দিতে। আলোকিত করতে, স্বচ্ছতা দিতে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে মুক্ত বুদ্ধি আর জ্ঞান চর্চ্চার সেরা স্থান। সেখান থেকে যারা নিতে যানে, তারা নিতে পারে বহুকিছু।
জ্ঞানের বাহাদুরি দিয়ে পৃথিবীতে কী করা যায় দেখিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর মোট জনসংখার মাত্র ০.২ শতাংশ ইহুদি সম্প্রদায়। নিজের পরিচয় ধরে রেখে পুরো বিশ্বকে ফুটবল বানিয়ে তারা এখন খেলছে মেসি, রোনাল্ডোর মতো! কখনো গোল করছে, কখনো করাচ্ছে অন্যকে দিয়ে। মাঠের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে খেলা শুরুর পাঁয়তারা করছে ভারতীয়রা।
এদেশে এক সময় উচ্চ শিক্ষায় বাঙ্গালী আঙ্গুলে গুণা যেত। মা বাবাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রজন্ম একে ডালভাত বানিয়েছে। বিলাতে আমাদের সন্তানেরা অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, এলএসই, ইউসিএল, ইম্পেরিয়াল কিংবা কিংসে যাচ্ছে এসব আর কোন খবর নয়। বার্নেটের কুইন এলিজাবেথ গ্রামার স্কুল থেকে সাদাফসহ ৩ জন বাঙ্গালী ছেলে এবছর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। বাকী দুইজনের একজন আকিফ ক্যামব্রীজে ন্যাচারাল সায়েন্স নিয়ে আর মাজহার মেডিসিন পড়বে ইম্পেরিয়ালে।
আর আমাদের আত্মীয় এবং পারিবারিক বন্ধুদের ছেলে মেয়েদের মধ্যে করোনায় প্রয়াত ডাঃ ফয়সাল ভাইয়ের ছেলে ইনতিসারও সাদাফের মতো এলএসইতে (পলিটিক্স এন্ড ইকোনোমিক্স), কংকা ইউসিএলে (পলিটিক্স এন্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস), লামিয়া কেন্টে (আর্কিটেকচার), নাতনী তানজু এসেক্সে (ল) এবং নির্বাণ বাথ ইউনিভার্সিটিতে (ম্যাথস) যাচ্ছে।
গত বছর রিভু গিয়েছিল অক্সফোর্ডে (ল), অর্ণব কিংসে (মেডিসিন), শামস ব্রুনেলে (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) সেজুতি কেন্টে (বায়ো মেডিকেল সায়েন্স), মেহলিয়া সিটিতে (বায়ো মেডিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং), তানজিলা কেন্টে (ফাইন্যান্স), জাফরিন রয়েল হলওয়েতে (কম্পিউটার সায়েন্স), নৈরিতা রয়েল হলওয়েতে (ফিজিক্স), ইয়াফি ইউসিএলে (ইকোনোমিক্স) এবং নাঈম সিটি ইউনিভার্সিটিতে (ইকোনোমিক্স এন্ড ম্যাথস)।
আগামী বছর যাবে সামি, অরন্য, নাহিয়ান, বিশাল।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকনাইতো মহাদেশ গড়ে। প্রতিটি জীবনই আশা জাগায়। আশাহীন জমিনে শক্তি জন্মায় না।
আমার ফেলে আসা পথে সাদাফ এবং অন্য ভুবনে তার বন্ধুদের আলোর যাত্রা সফল হোক এই প্রার্থনাই রইল।
‘আমার মুক্তি আলোয়, আলোয়, এই আকাশে…’
লন্ডন,১০ আগষ্ট ২০২১।

লেখক :পলিটিক্যাল এডভাইজার, মেয়র অব টাওয়ার হ্যামলেটস জন বিগস  


সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

"এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব " -সম্পাদক