বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যুক্তরাজ্য শাখার প্রতিবাদ সভা  » «   বাহরাইনে শেখ রাসেলের জন্মদিন পালিত  » «   কোম্পানীগঞ্জ তেলিখাল ইউপি নির্বাচনে স্বামী স্ত্রী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী  » «   সিলেটে মেয়রের বিরুদ্ধে লন্ডন প্রবাসী পরিবারের ৮ কোটি টাকা মূল্যের জায়গা দখলের অভিযোগ!  » «   বানিয়াচংয়ে পিতলের মূর্তি চুরির অভিযোগ : সংসদ সদস্য এডঃ আব্দুল মজিদ খানের পরিদর্শন  » «   পূর্ব লন্ডনের ওয়েস্টফিল্ড স্ট্র্যাটফোর্ডে আগুন  » «   ৩ অক্টোবর ইপসুইচে ‘লেটস বিট ক্যান্সার’ চ্যারেটি রোড শো ও ক্যান্সার এওয়ারনেস কার্যক্রম  » «   ব্রিটে‌নে ছুরিকাঘাতে এম‌পি স্যার ডেভিড অ্যামিসের মৃত্যু  » «   শিশিরকণা ঘাসে বইর মোড়ক উন্মোচণ  » «   ইস্ট লন্ডন মসজিদের উদ্যোগে নবম মুসলিম চ্যারিটি রান ২৪ অক্টোবর  » «   গোলাপগঞ্জ কাঁচাবাজার সঞ্চয় ও ঋন দান সমবায় সমিতি লিমিটেডের ত্রি- বার্ষিক নির্বাচন সম্পন্ন  » «   যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের অনন্য অবদানের স্মারক ও গৌরবের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেন্টারকে একটি প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে- হাই কমিশনার  » «   নবনির্বাচিত দুই সংগঠনকে জালালাবাদ এসোসিয়েশন ইউকের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন  » «    হাউস অফ লর্ডস এ বিসিএ‘র রেষ্টুরেন্ট অফ দ্যা ইয়ার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত  » «   শারদীয় দুর্গোৎসব  » «  
সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন

অদেখা আলতাব আলী এখনো জীবন্ত মনে ও প্রাণে



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 300
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বর্ণবাদ সেই দৃষ্টিভঙ্গি, চর্চা ও  ক্রিয়াকলাপ যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবেই অনেকগুলো গোষ্ঠীতে বিভক্ত এবং একইসাথে বিশ্বাস করা হয় কোনো কোনো গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য উঁচু বা নিচু; কিংবা তার উপর কর্তৃত্ব করার অধিকারী ; অথবা বেশি যোগ্য কিংবা অযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ গাত্র বর্ণ, সামাজিক অবস্থান, অর্থ – বিত্ত, শিক্ষা- দীক্ষা, ক্ষমতার বাহাদুরী ইত্যাদি নানা বিষয় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বর্ণবাদী করে তোলে। বর্ণবাদের  স্বরূপ একদিকে যেমন ভয়ঙ্কর, অন্যদিকে মারাত্মক সর্বনাশী ।

স্বদেশ ছেড়ে আমরা যারা প্রবাসে আবাস গড়েছি, অল্প – বিস্তর  সবাই বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছি বললে বোধকরি ভুল বলা হবে না।

ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের বসতি স্থাপনের ইতিহাস মোটেও সুখকর নয়। বসতি গড়ার পথ মসৃন ছিলোনা, বরং ছিল বন্ধুর। ঘৃণ্য প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদসহ পথে- ঘাটে অশিক্ষিত, বর্বর বর্ণবাদী গুন্ডাদের হাতে বাঙালিদের নাজেহাল হতে হয়েছে প্রতিনিয়ত।

সত্তরের দশকের টাওয়ার হ্যামলেটস্ আর আজকের টাওয়ার হ্যামলেটসের মধ্যে রয়েছে আকাশ – পাতাল ব্যবধান। তখন এক ধরণের অনিশ্চিত ও আতঙ্কময় জীবন অতিবাহিত করতেন বাঙালিরা। মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি সে সময় সন্ধ্যা ছ’টার পর ন্যাশনাল ফ্রন্ট এর গুন্ডা বাহিনী “স্কিন -হেডদের” দৌরাত্ম্যে বাঙালিরা ব্রিকলেন এলাকায় চলাফেরা করতে পারতেন না। “প্যাকি ব্যাশিং” শ্লোগানে তারা নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালাতো। অন্যান্য এশিয়ান কমিউনিটির লোকজন, আফ্রিকান, জুইশ কমিউনিটির কেউই বর্ণবাদী হামলা থেকে রেহাই পাননি। আরো শুনেছি তখন যারা কাউন্সিল এর বাড়িতে থাকতেন, তাদের জানালা ভাংচুর করা, ইট -পাটকেল মারা, দরজার ভিতর দিয়ে আবর্জনা ফেলা, দরজার সামনে মল – মূত্র ত্যাগ করা, “প্যাকি” বলে সম্বোধন করা এসব কিছু ছিলো স্কিন-হেডদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ। এখানেই শেষ নয়, সংখ্যালঘুদের বাড়ির দরজায় বর্ণবাদী কুচক্রীর  দল  নিয়মিত  পোস্টার সেঁটে দিতো। যার উপর লেখা থাকতো “নো আইরিশ”, “নো ব্ল্যাকস”, “নো প্যাকিস”। এছাড়া বাঙালিদের আসা – যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল টাওয়ার হ্যামলেটস্ এর বেশিরভাগ এলাকায়। মোটকথা টাওয়ার হ্যামলেটস্ তথা পূর্ব লন্ডনে এক ধরণের বিভীষিকাময় জীবন যাপন করতেন আমাদের পূর্ব পুরুষরা। “স্কিন  – হেডদের” বঞ্চনা, গঞ্জনা  বাঙালিরা সহ্য করেছেন দিনের পর দিন। তাদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদী হবার সৎ সাহস তখন পর্যন্ত বাঙালিদের ছিল না। কারন মাইকেল ফেরিয়ার নামের  কৃষ্ণাঙ্গ এক যুবককে হত্যা করেছে বর্ণবাদীরা। নিউহ্যাম এলাকায় বর্ণবাদী দুর্বৃত্তরা হত্যা করেছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কেনেথ সিং কে।  ওয়ালথাম ফরেস্ট বারায় ন্যাশনাল ফ্রন্টের রক্ত পিপাসুরা আগুন দিয়ে পাকিস্তানী খান পরিবারসহ তাঁদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। খান পরিবারের জীবন্ত মানুষগুলো আগুনের লেলিহান শিখায় দগ্ধ হয়ে ভয়ানক মৃত্যুবরণ করেন। কি অমানবিক নির্যাতন নরপিচাশদের!  সর্বত্র সুনশান নীরবতা।  সবার মাঝে থমথমে ভাব বিরাজমান।

শেষ পর্যন্ত বাঙালিদের অন্ধকার থেকে আলোতে এনে সংঘবদ্ধভাবে ন্যাশনাল ফ্রন্টের বিরোধিতা করার সাহস ও শক্তি দুটোই যুগিয়েছিলেন ৫ফুট ৪ইঞ্চি লম্বা, ঝাঁকড়া চুলের বাঙালি যুবক আলতাব আলী।৪ঠা মে, বৃহস্পতিবার, ১৯৭৮ সাল।লোক্যাল কাউন্সিল ইলেকশনের দিন। টাওয়ার হ্যামলেটসের ওয়াপিং এলাকার “রেয়ারডন হাউজের” বাসিন্দা ২৫বছর বয়স্ক আলতাব আলী প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন।

পূর্ব লন্ডনের হ্যানবেরি স্ট্রীটের একটি পোশাক তৈরির কারখানায় কাজ  করতেন তিনি ।সহকর্মী ও বন্ধুদের বলেছিলেন “শপিং করেছি, বাড়ি গিয়ে রান্না করবো তারপর ভোট দিতে যাবো”।  কে জানতো এটাই হবে সহকর্মী এবং বন্ধুদের সঙ্গে আলতাব আলীর শেষ দেখা! শপিং ব্যাগ হাতে ব্রিকলেনের মুখ থেকে বেরিয়ে তিনি যখন “সেইন্ট মেরীজ পার্ক” (অনেকে চিনতেন “সেইন্ট মেরীজ গার্ডেন,  “হোয়াইট চ্যাপেল পার্ক” এবং “এডলার স্ট্রিট পার্ক” বলে) এর কাছাকাছি পৌঁছুলেন, ঠিক তখনই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওঁৎপেতে থাকা তিনজন বর্ণবাদী হায়েনা অতর্কিতে ছুরি দিয়ে হামলা চালিয়ে আলতাব আলীকে হত্যা করে। সময় আনুমানিক সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট হলেও গ্রীষ্মকাল বলে চারিদিকে দিনের আলো। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে তা বোঝার উপায় নেই। প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যাকান্ড ঘটানোর পর সতেরো বছর বয়সী  হত্যাকারী রয় আর্নল্ড, কার্ল লাডলো এবং ১৬ বছর বয়সী যার নাম উল্লেখ করা হয়নি, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বলেছিলো যে, তারা আলতাব আলীকে চিনতো না। আলতাব আলী কে, কি করেন তা নিয়েও তাদের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না।   তারা তাঁকে হত্যা করেছে, কারন আলতাব আলী ছিলেন তাদের কথায়  একজন “প্যাকি”। হত্যাকারীরা আরো বলেছিলো “প্যাকি” দেখলেই তারা মারধর করতো, পকেট থেকে টাকা – পয়সা বা মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নিতো, হাস্য তামাশা করতো যা ছিলো তাদের জন্য একধরণের আমোদের বিষয়।  যাকিনা তারা ভীষণ উপভোগ করতো। উল্লেখ্য সে সময় কোনো ইংরেজ সলিসিটার পাওয়া যায়নি আলতাব আলী হত্যা মামলা পরিচালনার জন্য। শেষ পর্যন্ত একজন ইহুদি সলিসিটার মামলা পরিচালনা করেন। জানা যায় সলিসিটার সরকারের কাছ থেকে আলতাব আলীর পরিবারের জন্য নয় হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পেরেছিলেন।  অন্যদিকে হত্যাকারীদের পুলিশ সনাক্ত করতে সক্ষম হয়।  হত্যাকারীরা আন্ডার এইজ হওয়ায় মামলার রায়ে তিনজনের সাত বছরের কারাদণ্ড দেন মহামান্য আদালত।

রাত প্রায় দশটার কাছাকাছি। “রেয়ারডন হাউজে” মামাতো ভাই এবং অন্যান্য স্বজন অপেক্ষা করছেন আলতাব আলী বাড়ি ফিরলেই একসঙ্গে রাতের খাবার খাবেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস! আলতাব আলীর পরিবর্তে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লো ক’জন পুলিশ। স্বজনদের কাছে আলতাব আলীর মৃত্যুর খবর দিলো। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন  তাঁরা ।

আলতাব আলীর হত্যাকাণ্ডের সাথে স্বজনদের যোগসাজস আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার জন্য পুলিশ মামাতো ভাইসহ অন্যান্যদের শেষ পর্যন্ত হেনস্তা না করে ক্ষান্ত হয়নি। উল্লেখ্য বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ  এর শাহ মোল্লাতা গ্রামের ছেলে আলতাব আলী আর্থিক স্বচ্ছলতা  আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের     আশায় মামার সাথে ব্রিটেনে  পাড়ি জমিয়েছিলেন  ১৯৬৯ সালে। সাত ভাই  – বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়ো। খুব নিরিবিলি স্বভাবের মানুষ ছিলেন। বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন। রান্না করতে পছন্দ করতেন।  মৃত্যুর তিন বছর আগে দেশে গিয়ে বিয়েও করেছিলেন।  একই এলাকার বিলপার গ্রামে তার শ্বশুর বাড়ি।  প্রিয়তমা স্ত্রীকে ব্রিটেনে আনার লক্ষ্যে ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন আলতাব আলী।  যদিও সে সময় স্ত্রী ব্রিটিশ ভিসা পাননি। আলতাব আলী ভেবেছিলেন পরবর্তীতে ভিসার তারিখ পড়লে তিনি নিজে বাংলাদেশে গিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় ব্রিটিশ এম্বেসিতে যাবেন। সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে! আলতাব আলীর সঙ্গে স্ত্রীর শেষতক আর দেখা হয়নি। জীবন্ত স্বামীর বদলে ফিরে পেয়েছিলেন নিহত স্বামীর মরদেহ।

আলতাব আলীর মৃত্যু সংবাদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ার পর বাঙালিদের মনে “স্কিন – হেডদের” বিপক্ষে”এতদিনের জমে থাকা চাপা ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতো উৎসারিত হতে থাকলো। বাঙালি কমিউনিটি  জেগে উঠলো। শুরু হলো বাঙালিদের বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন।

কমিউনিটির নেতৃস্থানীয়দের উদ্যোগে  জন্ম হলো “আলতাব আলী অ্যাকশন কমিটি”, “ইয়ুথ ফ্রন্ট”, প্রগ্রেসিভ ইয়ুথ সংগঠন”, “ইয়ুথ লীগ” সহ বিভিন্ন সংগঠনের। এসব সংগঠনের ছত্র ছায়ায় থেকে বাঙালি যুব সমাজ এককাট্টা হয়ে শুরু করেছিলেন অধিকার আদায়ের আন্দোলন।

আলতাব আলীকে হত্যার প্রতিবাদে বাঙালিদের সাথে রাস্তায় নেমেছিলেন ভারতীয়, পাকিস্তানী, আফ্রিকান, জুইশ কমিউনিটিসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন। আলতাব আলীর মৃত্যুর দশ দিনের মাথায় হাজার- হাজার প্রতিবাদী জনতা তাঁর মৃতদেহ বহন করে “ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট, ইউনাইট এ্যান্ড ফাইট” শ্লোগানে হাইড পার্ক, ট্রাফালগার স্কোয়ার, ডাউনিং স্ট্রিটসহ লন্ডনের রাস্তায় – রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পূর্ব লন্ডনে বর্ণবাদ সমস্যার সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনাই ছিল প্রতিবাদ – বিক্ষোভের মূল উদ্দেশ্য।

এদিকে  আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই আলতাব আলীর মৃত্যুর দুই মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে  ১৯৭৮ সালের জুন মাসে হ্যাকনিতে বর্ণবাদী হামলায় ইসহাক আলী প্রাণ হারান।

ইসহাক আলীর মৃত্যু বাঙালি যুব সমাজকে ভীষণভাবে ক্ষেপিয়ে তোলে। ন্যাশনাল ফ্রন্টকে পরাভূত করে “ব্যাটেল অফ ব্রিকলেন” জয়ের শপথ নেন আন্দোলনকারীরা। বাঙালিদের জোড়ালো আন্দোলনের  মুখে শেষ অবধি ন্যাশনাল ফ্রন্ট এর গুন্ডারা ব্রিকলেন ছাড়তে বাধ্য হলেও সুযোগ বুঝে তারা আবারো গর্ত থেকে বেরিয়ে বাঙালিদের উপর হামলা অব্যাহত রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্ণবাদী হায়েনারা ১৯৮০ সালে ব্রিকলেনের ফ্লাওয়ার এন্ড ডিন স্টেটের বাসায় গিয়ে হামলা চালিয়ে মামা, ইসমত আলীকে হত্যা করে।  আহত করে ভাগ্না, ওয়ারিস আলীকে।

১৯৯৩ সালে কুদ্দুস আলী  ওয়াটনি মার্কেটের কাছে বর্ণবাদী হামলার শিকার হন। বরণ করেন পঙ্গুত্ব।  একই বছর  মুক্তার আহমেদ উইভার্স ফিল্ডে বর্ণবাদী হামলার শিকার হন। তাঁর শরীর থেকে আজও হামলার চিহ্ন মুছে যায়নি।

২০০১ সালে পপলারে নিজ বাড়ির সামনে বর্ণবাদী হামলায় প্রাণ হারান শিবলু রহমান। জানা যায় আলতাব আলীকে হত্যা করার বহু আগে ১৯৭০ সালের ৪ঠা এপ্রিল তসির আলী বলে একজন বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল।

তসির আলী “উইম্পি রেস্টুরেন্টে” কাজ করতেন।  থাকতেন বো এলাকায়। কাজ শেষে মধ্যরাতে বাড়ি ফেরার সময় তাঁর ফ্ল্যাটের সামনে দুজন শ্বেতাঙ্গ যুবক ছুরি দিয়ে  হামলা চালিয়ে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।  তবে সেই হামলাকে বর্ণবাদী হামলা বলে চিহ্নিত করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে তখন টাওয়ার হ্যামলেটসে বাঙালি লোকসংখ্যা কম থাকায় তসির আলীর মৃত্যুকে নিয়ে কোনো ধরণের আন্দোলন হয়নি।  তবে সেদিন তসির আলীর উপর হামলা যে বর্ণবাদীদের সুপরিকল্পিত জঘন্য কাজ ছিল আজ তা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার।

আলতাব আলী ব্রিটেনে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক।তাঁর নামের সাথে জড়িয়ে আছে ঘৃণ্য বর্ণবাদীদের জঘন্য কর্মতৎপরতা।

আলতাব আলী নামটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বমানবতার মোড়ল বলে দাবীদার এই ব্রিটেনেও বেঁচে থাকার অধিকারটুকু সংগ্রাম করে আদায় করতে হয়।

আলতাব আলী কে প্রবাসে বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনের  “অগ্রদূত” হিসেবে স্মরণীয় করে রাখার জন্য টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিল বাঙালিদের দাবীর মুখে ১৯৯৮ সালে “সেইন্ট মেরীজ পার্কের” নাম বদলে “আলতাব আলী পার্ক” নামকরণ করেছে।বছর দু /তিনেক আগে পার্কের সম্মুখে অবস্থিত “এডলার স্ট্রীট বাস স্টপের” নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে “আলতাব আলী বাস স্টপ”।কয়েকজন সংগ্রামী বাঙালি নেতার উদ্যোগে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “আলতাব আলী ফাউন্ডেশন”।

স্থানীয় বাঙালি নেতৃবর্গের অনুরোধে চলতি বছরের গোড়ার দিকে ওয়াপিং এ নবনির্মিত একটি আবাসিক ভবনের নাম “আলতাব আলী হাউজ” করার পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছে টাওয়ার হ্যামলেটস্  কাউন্সিল।  তাছাড়া ২০১৫ সালের অক্টোবরে কাউন্সিল প্রতি বছর ৪ঠা মে “আলতাব আলী দিবস” পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব কিছু অর্জন বাঙালিদের আন্দোলনেরই ফসল।  আমি মনে করি বাঙালি নতুন প্রজন্মের সাথে আমাদের অহংকার আলতাব আলীকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পাশাপাশি “ব্যাটেল অফ ব্রিকলেন ” এ সংগ্রামী বাঙালিদের বিজয়ের কাহিনী নিয়ে ৪ঠা মে টাওয়ার হ্যামলেটস্  এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানা ধরণের অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করা উচিত। এ দায়িত্ব নিতে হবে কাউন্সিলকেই।

একই সঙ্গে ব্রিটেনের বাংলা টিভিচ্যানেলগুলি আলতাব আলীসহ এযাবৎ বর্ণবাদী হামলায় আহত – নিহত আমাদের অতি আপনজনদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ব্যবস্থা করতে পারে।

উল্লেখ্য ব্রিটিশ সরকারের ব্যর্থতার কারণেই বর্ণবাদীদের হাতে আলতাব আলীর মৃত্যু ঘটেছে।তাই আমি মনে করি বাংলাদেশে আলতাব আলীর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকারের উপরই বর্তায়।ব্রিটেনে আলতাব আলী দিবস পালন করে আমরা সাময়িক আত্মতৃপ্তি পেলেও তাঁর পরিবারের প্রতি আমাদের কর্তব্যের কথা ভুলে গেলে চলবেনা।আসুন এবছরের “আলতাব আলী দিবসে” আমরা তাঁর পরিবারের জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে “মাসিক ভাতা” আদায়ের আন্দোলন করার প্রতিজ্ঞা করি।

দুর্বলের উপর উগ্রবাদী সবলদের  অত্যাচার এখনো ব্রিটেন থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে যায়নি।  আমাদের মনে রাখা দরকার এখনো ন্যাশনাল ফ্রন্টের বর্ণবাদী গুন্ডারা তৎপর।

সুযোগ পেলেই তারা কখনো “ইংলিশ ডিফেন্স লীগ ” আবার কখনো “ব্রিটেন ফার্স্ট” বিভিন্ন নামে  আত্মপ্রকাশ করে তাদের কুতৎপরতা চালিয়ে যাবার পায়তারা করছে। জানান দিচ্ছে তাদের প্রতিহিংসা আর বদলা নেয়ার কথা।  পত্র – পত্রিকা এবং টিভি কিংবা বেতার সংবাদে আজও বর্ণবাদী  হামলার ঘটনার  পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। এদের রুখতে  তাই আমাদের সদা সজাগ থাকতে হবে।  আমাদের চলাফেরায় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। মাথা নত না করা এবং কিভাবে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা যায় সে ব্যাপারে  “ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার” আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তা না হলে আলতাব আলীর প্রতি আমাদের ঋণ শোধ হবে না। আজ “আলতাব আলী পার্ক ” ব্রিটেনের বাঙালিদের অধিকার আদায়ের প্রতীকী স্থানে পরিণত হয়েছে। “আলতাব আলী পার্কের” এককোণে ১৯৯৯ সালে নির্মিত হয়েছে “শহীদ মিনার”। যা বর্ণবাদীদের গালে চপেটাঘাত হয়ে বাঙালিদের সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হয়ে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে; যা দেখে আমরা প্রতিনিয়ত অহংকারে উজ্জীবিত হই। অদেখা আলতাব আলী এখনো জীবন্ত মনে ও প্রাণে। গভীরভাবে অনুভব করি তাঁকে।

(এ লেখাটিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন শ্রদ্ধাভাজন ড: রেণু লুৎফা এবং জনাব আনসার আহমেদ উল্লাহ। তাঁদের দুজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি)।

লেখক: শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও কমিউনিটি কর্মী ।


সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 300
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

"এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব " -সম্পাদক