শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১ খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
হবিগঞ্জের বানিয়াচং-নবীগঞ্জ রোডে গণ-ডাকাতি সংঘটিত  » «   মায়ের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে ছেলের সংবাদ সম্মেলন  » «   গোলাপঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা তাহের আলীর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন  » «   লেখক মুশতাকের মৃত্যু কারাগারে: প্রগতিশীল ছাত্র জোটের তাৎক্ষনিক প্রতিবাদ  » «   বিএনপির  ৭ই মার্চ পালনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সুলতান মনসুর  » «   নিউজ কনটেন্ট নিয়ে ফেসবুকের সমঝোতায় অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে ঐতিহাসিক আইন পাশ  » «   চামচামির  রাজনীতি  এবং  ফেইসবুকে ভাড়া খাটা কর্মীরা  » «   বানিয়াচং আদর্শ বাজারে অগ্নিকান্ডে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি  » «   ভালুকায় ইটভাটায় একপক্ষের বেলচার আঘাতে কলমাকান্দার জাহাঙ্গীর নিহত  » «   গোলাপগঞ্জে পৃথক অভিযানে গাঁজাসহ ৩ মাদক ব্যবসায়ী আটক  » «   বিয়ানীবাজার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট  ইউকের দোয়া ও আলোচনা অনুষ্ঠিত  » «   মাতৃভাষা দিবসে বার্সেলোনায়   স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের দাবী  » «   মহামারির কারণে ব্রিটেনে বেকারত্বের হার ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ  » «   ইউরো বাংলা প্রেসক্লাব এর মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা  » «   শহীদ দিবসে জালালাবাদ এসোসিয়েশন ইতালীর দোয়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত  » «  

ব্রিটেনে করোনা সময় : ‘… আমাদের কেউ নেই’



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘…জ্বী, আমার নাম জুবের, বললে কি বিশ্বাস করবেন? লন্ডনের মতো শহরে থেকেও  আমি  খাবারের কষ্টে ভোগি। অথচ এই আমি প্রতিমাসে ঋণ করে দেশে পরিবারকে টাকা পাঠাই। করোনায় লকডাউন শুরুর  পর থেকেই  আমার কাজ নেই।ইলিগ্যাল থাকার কারণেই মূলত কাজ নেই। লিগ্যালদের তুলনায় কম বেতনে রেষ্টুরেন্টে জব করতাম। থাকা , খাওয়া ফ্রি ছিল। লকডাউন শুরুর এক মাসের মাথায় রেষ্টুরেন্ট থেকে বের করে দিয়েছে। থাকারও জায়গা নেই। সাথে খাবারও নেই।

অনেক অনুরোধ করেছি রেষ্টুরেন্ট মালিককে, করোনার কথা ভেবে অন্তত থাকার জায়গাটা দিন। নিজ খরছে খাবো। যখন দরকার পড়বে  কাজে   সাহায্য  করবো , টাকা নেব না। শুধু থাকার জায়গাটা দেন। রুমগুলো এমনিতেই খালি থাকবে। গাভনার কথার মাঝখানেই বলেছে, কাগজপত্র নাই। আমি কোন ঝামেলায় যেতে চাইনা।

বলতে যেয়েও বলিনি যে, আমার কাগজ থাকলে কী রেষ্টুরেন্টে থাকার জন্য হাতজোড় করি তোমার কাছে?

নয় বছর থেকে কাগজপত্রহীন আমি লন্ডনে আছি। শারীরিক ও মানষিক কষ্ট হলেও খাবার কষ্টে পড়িনি। এখন রোজ দুবেলা খাবার খেতেও পারছিনা টাকার কারণে।

এই নয় বছরে দূর সম্পর্কের চাচার বাসায় মাঝে মাঝে বেড়াতে আসতাম। মাঝে মধ্যে অফ-ডে  বেড়াতে এসে রাতে থেকেছিও।  চাচা হার্টের রোগী, করোনা সময়ে তার অবস্থাও বেশী ভালো নয়। সেখানেও থাকার ব্যবস্থা নেই।

ভাড়া করা  একটি ফ্লাটে সাত আটজন অনেক রিক্স নিয়ে থাকি। মাসের ভাড়া এবং খাবার মিলিয়ে যে টাকা দরকার  তা যোগাড় করা রীতিমতো অসম্ভব। তার উপর প্রতি মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। সঞ্চয় যা ছিল, সব শেষ,  ঋণের  উপর আছি। আগামীতে মনে হয়  ঋণও পাবোনা। ইলিগ্যালদের কেউ ঋণ দিতে চায় না। যাদের সাথে থাকি, তাদের অনেকের অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। এখন আমরা দুই বেলা সবচেয়ে সস্তা সবজি দিয়ে খাবার খেতেও কষ্ট করছি। জানিনা, আর কতদিন এভাবে চলতে হবে।বাচবো  না কি মরে যাবো। মরলে লাশটাও এই করোনা সময়ে পরিবার পাবে না। আমাদের তো কেউ নেই।’

খ.

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় লকডাউন সময়ের আগে, রাসেল এর সাথে দেখা। অনেক দিন পরে দেখা, পাতাল ট্রেনে। জানতাম , লন্ডন থেকে অনেক দূরের একটি  শহরে থাকে । কেমন আছো? বলতেই রাসেলের চেহারা মলিন হয়ে যায়। মাথা নিচু করে জ্যাকেটে হাত ঢুকিয়ে নিচু স্বরে বলে, ‘আমরার আর  থাকা…।  লকডাউন শুরু হলে লন্ডনে আসি। মামার বাসায় উঠেছিলাম। মাস দিন থেকেছি। মামাতো ভাই বোন ছোট ছোট। থাকার জায়গাও ছিল। কিন্তু মামী আমাকে রাখতে চাননি। একদিন সকালে আমাকে একা ডেকে বললেন, আমি যেন ভাড়াবাসা দেখি। তার বাচ্চাদের সমস্যা হচ্ছে। তারপরের দিন  মামার বাসা ছেড়ে এক বন্ধুর বাসায় দুইদিন থেকেছি। এখন কয়েকজন মিলে ইস্ট লন্ডনের কমভাড়ার একটি বাসায় কয়েকজন মিলে আছি।

আমাকে কোন কিছু বলতে না দিয়েই রাসেল বলল, আপনার তো অনেক জানা শুনা আছে- আমাকে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? যে কোন কাজ, মোটামোটি ওয়েজেস হলেও সমস্যা নাই। মায়ের অসুস্থতায় প্রতিমাসে অনেক টাকা লাগে।এখানে আমি নিজেই অসহায় হয়ে আছি….। কয়েকদিন বিন্ডারী কাজ করেছি। এখন তাও নাই।

আমি তার মুখের দিকে খুব কষ্ট করে তাকাতেই দেখি তার চোখ জলে টপ-টপ করছে…. ।

গ. 

নারগিস শেলী  একটি পাউন্ডসপে কাজ করতেন।  পূর্ব থেকে পরিচিত।  পূর্ব লন্ডনের ওয়াটনী মার্কেট থেকে ফিরবো এমন সময়  কাঁচাবাজারের ওয়ানটাইম নীলব্যাগ হাতে নিয়ে পেছন থেকে ডাকতেই –ফিরে থাকাই, কথা বলি। হেটে হেটে নিচু স্বরে বললেন, ‘ভাই, আর পারছিনা। হাজব্যান্ড এরও কাজ চলে গেছে। গত সপ্তাহ থেকে আমিও কাজে নেই। বস দোকানে বিজি নেই বলে কাজে না আসার কথা বলেছেন। অনুনয় করে বললাম,‘আপনি তো জানেন, আমাদের ইমিগ্র্যাশন ষ্টেটার্স। অনন্ত পার্টটাইম রাখেন, প্লিজ।’

এতোদিন থেকে কাজ করছি তার সপে, করোনা মহামারীর মতো বিপদেও একটু মন গলেনি।

‘মাস শেষে ৬শত পাউন্ড বাসা ভাড়া।খাবার খরচ না হয় বাদই দিলাম। আমার জন্য একটি কাজ দেখবেন, যে কোন কাজ।‘

আমি মাথা নিচু করে  হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াই। আর শেলী আপা ওড়না টেনে  চোখের জল লোকাতে থাকেন…।

ঘ.

এক  বিল্ডারের সাথে সহযোগি হিসাবে কাজ করছে রুবেল।  আগে রেষ্টুরেন্টে কাজ করতো। সেখানে ইমিগ্রেশন জটিলতার কারণে কাজ পাচ্ছিলনা। তাই বাধ্য হয়েই অনেক পরিশ্রমের বিল্ডারি কাজ করছিল। প্রথম লকডাউন পরবর্তিতেও তার তেমন কোন কাজ নেই। চরম অর্থ সংকটে দিন পার করতে হচ্ছে। মাঝে মধ্যে দুই -এক দিন কাজ পেলেও বেতন ২৫% কম দিচ্ছে। তার পারিবারিক অবস্থা এমন যে, মাসের শুরুতে একটা নিদৃষ্ট অংকের টাকা দেশে পাঠাতেই হয়। ফলে, কম টাকার কাজেও  খুশী ছিল রুবেল। হঠাৎ করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। একদিন রাতে কানাজড়িত কণ্ঠে অসুখের খবর জানিয়ে বলেছিল,’..ভাই, আমি যদি মারা যাই, আমার লাশটাকে দাফনে সাহায্য করিও, এখানে আমার তো কেউ থেকেও নেই।’

ঙ.

বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারার  হোয়াইটচ্যাপেল খোলা মার্কেটে সবজির দোকানে কাজ করতেন পঞ্চাশ উর্ধ্ব হিরন মিয়া। করোনার দ্বিতীয় ফেইজের  লকডাউনের আগে ইস্ট লন্ডনের মাল্টি সুপারস্টোর সেইন্সবারীর সম্মুখ ফটকের পাশের চেয়ারে বসা।‘… ও ভাতিজা,বালানি… ’। দেখি আমার দিকেই আসছেন।নিচু স্বরে, অন্তত বিনয়ে, মাথা নিচু করে বললেন, অল্প কিছু সাহায্য করতে পারবো কি না।

তারপর জানাগেল- করুণ কাহিনী। (আগেই জানতাম হিরনচাচা টানা পঁচিশ বছর থেকে দেশের বাইরে । দীর্ঘদিন মিডল ইস্ট ছিলেন, সেখান থেকে লন্ডন এসেছেন,বৈধতার আবেদন করে অপেক্ষায় আছেন। শাক সবজি কিনতে গেলে প্রায় সব সময় একটি কথা খুব নির্ভরতায় আমাকে বলেন, ‘ভাতিজা,আবতো কিচ্ছু জানাইলনা, আমার লাগি দোয়া খরিও ভাতিজা….।) হিরনচাচা  যে ফ্লাটে মেসের মতো থাকেন, সেখানের পাঁচ মাসের ভাড়া দিতে পারেননি। সেখানেও  লুকিয়ে আছে আরেক  নৃশংসতা।স্টেইট এজেন্ট কে অনুনয় করে বলেছিলেন যে, ‘শুধু তার ভাড়ার অংশটি ভাগ করে  ব্যক্তিগতভাবে বকেয়া রাখার জন্য। তিনি কাজ পেলেই, প্রথমে তার ভাড়ার টাকাটা দিয়ে দিবেন। এজেন্ট মালিক কথা শুনতেই চায়নি, চোখ রাঙ্গিয়ে ঝাটকা মেরে উল্টো বলেছে- ‘তোমারে তো পুলিশে দেয়া দরকার।’

‘তারপর ঘরের মধ্যে হয়তো সবচেয়ে বয়স্ক থাকার কারণে  বাকী পাঁচজন  পাঁচ মাসের ভাড়া ভাগ করে দিচ্ছে। তাদেরও কাজ নেই। তবে আমি বলেছি-আমি কাজ পাওয়ার পরে, টাকাগুলো আস্তে আস্তে তাদের দিয়ে দিবো।’

চাচার করোনা সময়ের  করুণ কাহিনীর অপর অংশ  হল- মাত্র পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে নাদিয়াকে রেখে দেশান্তরি হয়েছিলেন। সেই মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে । ৩০ জানুয়ারী তার বিয়ে। মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা পাঠাতে হবে। নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে সঞ্চয় থাকে না, হিরণ চাচারও নেই। দেশে করোনা থাকলেও  স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোন বাধা- ধরা নিয়ম নেই। তাহলে হয়তো স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার নামে অথবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অজুহাতে কম টাকা খরচ এর একটা উপলক্ষ থাকত। তাই চাচা বাধ্য হয়ে- পরিচিতদের কাছ থেকে গোপনে সাহায্য কামনা করছেন।

উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলো  সত্য হলেও ঘটনার চরিত্রের নামগুলো ‘কাল্পনিক’। তবে করোনা সময়ে এটাই বাস্তবতা ব্রিটেনের  বাংলাদেশী এথনিক মাইনরিটি কমিউনিটিতে। বলা হয়ে থাকে,  প্রায় ৭ লক্ষ বাংলাদেশীর মধ্যে, আইনি ভাষায়  প্রায় ৭০/৮০ হাজার আনডকুমেন্ট বাংলাদেশী ব্রিটেনে বসবাস করছেন। করোনা সময়ের শুরু থেকে  মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা।

এই  ইমিগ্রান্ডদের সংখ্যাঘরিষ্ট অংশ কারী শিল্পের বিভিন্ন শাখায় কাজ করে থাকেন। অন্যান্যরা যে যেভাবে,  কাজের সুযোগ পান, সেভাবেই কাজ করেন। লকডাউন সময়ে ব্রিটেনের বাংলাদেশী মালিকানাধীন রেষ্টুরেন্টগুলো কার্যত বন্ধের উপক্রম হয়েছে। যেগুলো খোলা আছে, সেগুলোতে সরকার ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী শুধু টেকওয়ে  বিক্রির  ব্যবস্থা রয়েছে।  সঙ্গত কারণে রেষ্টুরেন্টগুলোতে এই সার্ভিস নিদৃষ্ট সংখ্যক স্টাফ দিয়েই পরিচালনা করা যায়। মোটাদাগে এই যুক্তিকে  সামনে রেখে এই বিশাল সংখ্যক স্টাফদের চাকুরীচুত্য করা হয়েছে।

কারী ইন্ড্রাষ্টি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন- করোনা মহামারীর কারণে  বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রায় এক লক্ষ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন।

পর্যবেক্ষকরা  বলছেন, বাস্তবতা আপাতত এই হলেও  মানবিকতা চরমভাবে দলিত হয়েছে কারী ইন্ড্রাষ্ট্রির অসংখ্য রেষ্টুরেন্টে। কারী ইন্ড্রাষ্টির সাথে জড়িত এবং চাকুরিচুত্যদের মতে, বিপর্যয় শুধু রেষ্টুরেন্ট মালিকদের জন্য আসেনি। সকলের জন্য এসেছে। আমাদের দুর্বলতার জায়গাটি তাদের অনেক ভালো করেই জানা। লকডাউন সময়ে আমাদের থাকার কোন জায়গা নেই। তারা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তত থাকার জায়গাটি দিতে পারতেন।

অনেকে বলছেন, বেশীরভাগ রেষ্টুরেন্টে  স্টাফদের  সাধারণত থাকা- খাওয়া ফ্রি থাকে, এজন্য যাদের নানাকারণে থাকার জায়গা নেই, তারা অনেক  কিছু ত্যাগ করেও রেষ্টুরেন্টে প্রধানত এই কারণে কাজ করে থাকেন। লকডাউনের  এই সময়গুলোতে তাদের তাড়িয়ে দেয়া চরম অমানবিকতার বহি:প্রকাশ। অনেকে কাজের বিনিময়ে থাকার জন্যও অনুনয় করেছেন। অনেকে নিজ খরচে খেয়ে বিনা ওয়েজেসে পার্টটাইম  কাজে সহায়তা করে থাকার জন্যও অনুরোধ করেছেন। কিন্তু রেষ্টুরেন্ট বসদের মন গলেনি। যদিও  এই অমানবিকতা চর্চায় অনেক ক্যাটারার্স ছিলেন না। দেশব্যাপী ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার ডাক্তার নার্স, কেয়ারারদের বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করে মূলধারায়  প্রসংশীতও হয়েছেন। কিন্তু  রেষ্টুরেন্ট স্টাফ সংকটের এই সময়ে সংখ্যাগরিষ্ট রেষ্টুরেন্টের মালিক করোনা মহামারী সময়ে মানবিক দৃষ্টিতে অন্তত স্টাফদের পাশে না দাড়ানোকে মোটাদাগে ভালো চোখে দেখেননি বেশীরভাগ মানুষ।

রেষ্টুরেন্ট স্টাফদের অনেকে আফসোস করে বলেছেন- অনেক রেস্টুরেন্ট থেকে  ফ্রন্ট লাইন ওয়ার্কারদের খাবার বিতরণ করা হয়েছে ঘটা করে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  নিজের পাবলিসিটির জন্য  যা যা করা দরকার সব করেছেন- নিজেকে মানবতাবাদি হিসাবে প্রকাশ করতে। অথচ  নিজ রেষ্টুরেন্টে এই বিপদেও তাদের থাকার জায়গাটুকু অনুনয়-বিনয় করেও  স্টাফরা  পায়নি।

তাদের অনেকে বলছেন- করোনা পেনডামিকে বিশেষ করে বড় রেষ্টুরেন্টগুলো  তুলনামূলক বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ছোট রেষ্টুরেন্টগুলো  তাদের সামগ্রিক ব্যয় কমিয়ে টেকওয়ে দিয়েই চলছে। কিন্তু মহামারি সময়ে  এই ইন্ড্রাস্টি সরকার ঘোষিত ফার্লো স্কিম এর মাধ্যমে দুই লকডাউনে উল্লেখযোগ্য হারে অনুদান পেয়েছে। বরিস জনসন সরকারের হসপিটালিটি ইন্ড্রাষ্টিকে পরোক্ষভাবে সহায়তার প্রকল্প- ইট আউট টু হেলপ আউট  স্কীমের  সুবিধা পেয়েছে। চ্যান্সেলর ঋষি শোনাক ঘোষিত হসপিটালিটি সেক্টরের ভেট ২০% থেকে কমিয়ে  ৫% ভেট সুবিধা পেয়েছেন। এমনকি সহজ শর্তে পেনডামিক সময়ের জন্য অনুমোদিত অত্যন্ত কম ইন্টারেস্টে লোন এর সুবিধাও ক্যাটারার্সরা পেয়েছেন। কিন্ত করোনা দুর্যোগ সময়ে তাদের রেষ্টুরেন্ট স্টাফদের থাকার সুবিধাটি পর্যন্ত অগণিত ক্যাটারার্স দেননি। অথচ এই তারাই রেস্টুরেন্টে স্টাফ সংকট নিরসনে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন, ওয়ার্ক পারমিট খোলার আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন, ব্রিটেনের নিউ জেনারেশনকে রেষ্টুরেন্ট ব্যাবসায় অনুপ্রাণিত করতে নানা কথা বলেছেন।

তবে এটাও সত্য যে, ব্রিটেনের অনেক রেষ্টুরেন্ট করোনা পেনডামিক সময়ে সার্বিকভাবে রেষ্টুরেন্ট স্টাফদের অতি আন্তরিক ছিলেন। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা ।

চ.

একই রকম কষ্টের কথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিলেন পাউন্ডসপে কাজ করা নারগিস শেলী আপা,‘ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সরকার দশ হাজার পাউন্ড প্রণোদনা দিয়েছে। এবং মন্দা হলেও  আমাদের দোকান  লোকসান দিচ্ছে না। তারপরও  এই বিপদে মালিক আমারে বের করে  দিল, একদিনের নোটিশে।’

বাঙালি অধ্যুষ্যিত টাওয়ার হ্যামলেটস বারায়  লকডাউন সময়ে এই রকম অসংখ্যজন আছেন, কম-বেশী একই রকম বেদনা ও কষ্ট বহন করে। সবচেয়ে করুণ বিষয় হল- অনেকে চাইলেও নিকট আত্নীয়দের বাসায় থাকতে পারছেন না। অবশ্য এখানে দুপক্ষ প্রায় নিরুপায়। প্রথমত, লন্ডন শহরের কাউন্সিল প্রদত্ত বাসা, বাড়িতে জনসংখ্যার তুলনায় রুমের সংখ্যা কম থকে। অর্থাৎ তিন বেড রুমের ফ্লাটে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ৫/৬ জন সদস্যের পরিবার থাকেন। দ্বিতীয়ত, প্রায় প্রতিটি ঘরে প্রবীন অথবা শিশুরা আছেন। এছাড়া লকডাউনে স্কুলগুলো সাধারণত বন্ধ থাকে। অনেক জায়গায় স্কুল খোলা থাকলেও কোন কোন ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বাসায় বসে অনলাইন ক্লাস করতে হয়- হোম আইসোলেশন পলিসির মধ্যে থাকলে। ফলত এই ত্রিমুখি ঝুকি নিয়ে কেউ-ই থাকতে চায় না। যা অন্যভাবেও বলা যায়- করোনার ঝুকি নিয়ে কেউ তাদের আত্নিয়- স্বজনদের থাকতে দিতে চায় না। তার উপর রয়েছে- লোকাল  কাউন্সিল অথরিটির আইন লঙ্ঘনের বড় ঝুকি।

ছ.

ব্রিটেনের মোট ৫১টি ছোট বড় শহরের মধ্যে বিশেষ করে লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, কার্ডিফ, লীডস ইত্যাদি শহরে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশী কমিউনিটি আছেন।

তবে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বারায় বাংলাদেশীদের বাস সবচেয়ে বেশী। এই বারাতে মোট জনসংখ্যার ৩৪% বাংলাদেশী এথনিক কমিউনিটির বাস। একই শহরের নিউহাম, রেডব্রিজ , ক্যামডেন বারায় বাস করছেন উল্লেখযোগ্য ব্রিটিশ বাংলাদেশী। তবে  বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বেশী জনসমাগম টাওয়ার হ্যামলেটস এর হোয়াইটচ্যাপেল ও ব্রিকলেন কে কেন্দ্র করে। একজন আরেকজনকে খুজে পেতে, কাজের সূত্র খুজতে আনডকুমেন্টদের এখানেই  আসা -যাওয়া সবচেয়ে বেশী।

করোনার দ্বিতীয় ছুবলে  ব্রিটেনে প্রতি মিনিটে মারা যাচ্ছে একজনেরও বেশী নাগরিক। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস( এনএইচএস) জানিয়েছে-  ব্রিটেনে এখন হাসপাতালগুলোতে  প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। লন্ডনের হাসপাতালগুলোর সামনে সারি সারি এম্বুলেন্সগুলোতে চিকিৎসা চলছে কোভিড ১৯ আক্রান্তদের (ইউরোপের সর্ব বৃহৎ হাসপাতাল রয়েল লন্ডন হসপিটাল থেকে  পাঁচ মিনিট  দূরত্বে বাস না করলে হয়তো  লন্ডনের করোনাকালটি কত নিষ্ঠুর তা কেউ আমাকে বলে বুঝাতে পারতো না )।

…এরই মাঝে চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে হীম ঠান্ডায় অর্থ ও ভালো খাবারের কষ্টে, ঋণের বোঝা বাড়িয়ে বাবা-মা ,পরিবারের কাছে টাকা পাঠিয়ে করোনাকালীন জীবন পার করছেন  হাজার হাজার ইমিগ্র্যান্ট। শুধুমাত্র একটি বৈধ পাসপোর্ট এর অভাবে তাদের জীবন  অন্যদের চেয়ে রাত আর দিনের পার্থক্য নিয়ে করোনাকালে দাড়িয়ে আছে- এই ধ্রুব সত্যটি তাদের মতো কেউ অনুভবে জানে না, বুঝতেও চায় না।

লন্ডনের ইভিনিং সময়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখছি- প্রচন্ড ঠান্ডাকে সঙ্গি করে গুড়ি গুড়ি তুষারের মতো খুব হালকা বৃষ্টি পড়ছে। ষ্ট্রিট লাইটের আলো নিভে গেলে মনে হবে কৃষ্ণ পক্ষের অন্ধকার। আর আমার বুকে জমাটবাধা জুবের আর রুবেল এর কথাগুলো বার বার কানে বাজছে  –

‘মরলে লাশটাও এই করোনা সময়ে পরিবার পাবে না। আমার তো কেউ নেই।’

‘ভাই, আমি যদি মারা যাই, আমার লাশটাকে দাফনে সাহায্য করিও, এখানে আমার তো কেউ থেকেও নেই।’

আ নো য়া রু ল  ই স লা ম  অ ভি : কবি, সাংবাদিক

লন্ডন,  উনিশ জানুয়ারী দুই হাজার একুশ।

আরও পড়ুন: 

আমিও ধর্ষক

 

 

 

 


সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

"এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব " -সম্পাদক