বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
কারী ইন্ড্রাস্টির সংকট মোকাবেলায় দরকার সমন্বিত উদ্যোগ  » «   বিবিসি প্রকাশ করেছে উইঘুর নির্যাতন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য  » «   মাদ্রিদে বাংলাদেশ দূতাবাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপন  » «   মাঙ্কিপক্স সংক্রমণ আরও ২ দেশে: বেলজিয়ামে ২১ দিনের কোয়ারেন্টিন ঘোষণা  » «   শুধুই নারীদের পরিচালনায় প্রথম সৌদি আরবের আকাশে উড়ল ব্যতিক্রমী ফ্লাইট  » «   গোলাপগন্জে চেয়ারম্যান প্রার্থী এলিম চৌধুরী’র মতবিনিময়  » «   দুদকের মামলায় হাজী সেলিম কারাগারে  » «   নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাশিয়ার মুদ্রা রুবল’র উত্থান  » «   কারী শিল্পের সংকট মোকাবেলায় সিবিআই প্রেসিডেন্টের কাছে  বিসিএ’র পাঁচ দাবী উপস্থাপন  » «   গোলাপগঞ্জে ভোটার হাল নাগাদ শুরু  » «   বার্সেলোনায় মাদারীপুর সমিতির ঈদ পুনর্মিলনী  » «   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসায় স্পেনের প্রেসিডেন্ট  » «   আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর চিরবিদায়  » «   ইতালির জেনোভায়‌ প্রবাসীদের কনস্যুলেট সেবা প্রদান  » «   বিয়ানীবাজার থানা জনকল্যাণ সমিতি ইউকে‘র দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত  » «  
সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন

হিরো আলম ও সাম্প্রদায়িক চেতনা



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

হিরো আলমের নতুন ‘গান’ নিয়ে ট্রল হচ্ছে। ব্যাপারটি হিরো আলম কিংবা শ্রমজীবী মানুষের জন্য তো পজিটিভ!
আমার ও আপনার বদৌলতে গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি ছেলে ‘শহুরে সংস্কৃতিতে’ ঢুকে পড়ছে, এতে আমাদের গাত্রদাহ হচ্ছে। ব্যাপারটা কি সেরকমই নয়?
ছেলেটি কালো, দেখতে আনস্মার্ট, গ্রাম থেকে উঠে আসা শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী—সমস্যা কি এখানেই?
নাকি সমস্যা তার যোগ্যতা নেই?
আহা আমার যোগ্যতা!
যোগ্যতাকে তো সময়ই কখনো চিনতে পারে না। আমরা প্রায়শই যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতির দিকে যাই, যাই ভেক ধরা ভেলকিবাজির দিকে!
যোগ্যতার কথা হলে বাংলাদেশে এই সময়ের অনেক অভিনয়শিল্পীই আজ অভিনয়শিল্পীর পরিচয়ে পরিচিত হতেন না। যোগ্যতার কথা বললে, এখনকার বাংলা সিনেমায় অনেক নায়কই নায়ক হতেন না কারণ তাদের বেশিরভাগেরই অভিনয় হয়ে ওঠে না। তখন কোনো সুপারস্টার খোঁজে পাওয়া যেতো না!
যোগ্যতার কথা বললে অনেক সাংবাদিকই হলুদ সাংবাদিকতার কারণে হতেন সাংঘাতিক ধরনের অমানুষ; অনেক রাজনীতিবিদই জনপ্রতিনিধির নামে জালিম হতেন না!
যোগ্যতার কথা বললে, দুর্নীতিবাজরা স্বপদে বহাল থাকতেন না।
যোগ্যতার কথা বললে অনেক কবি কিংবা লেখকই আর এই পরিচয়ে লেখাবাজি করতেন না। এইসব কবি কিংবা লেখক সহ সংস্কৃতি উদ্ধারকারীদের বলি, এই কি আপনাদের প্রগতিশীলতা যে একটা মানুষকে টেনে হিঁচড়ে নামাতে উঠে পড়ে লেগেছেন।
হিরো আলম তো চুরি করছে না, গানই গাইছে, কিন্তু তার গান গাওয়াটা ভালো হয়নি। তার মানে এইটা না তার একটা গান না হওয়ার কারণে পুরো সংস্কৃতির বলাৎকার হচ্ছে। সে তার জায়গা থেকে একটি গান গেয়েছে, সেটি এক ধরনের সস্তা বিনোদন হতে পারে যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে সমস্যাটা কোথায় সেটি বুঝে উঠতে পারছি না—আপনি না শুনলেই তো হয়।
ক্যাবল লাইনের ব্যবসা থেকে উঠে আসা একটি ছেলে যখন কিছু একটা করতে চাচ্ছে, সে সবার নজরে আসতে চাচ্ছে তখন তাকে কেনো বারবার অপরাধী বানানোর প্রচেষ্টা করা হচ্ছে সেটি অনেকেরই বোধগম্য নয়। তিনি তো নিজের প্রচেষ্টায় মিউজিক ভিডিও বানাতে বানাতে এক সময় স্যোশাল মিডিয়াতে হয়ে গেলেন পরিচিত। তিনি নিজের প্রচেষ্টায় আজ স্যোশাল মিডিয়ার একজন “এন্টারটেইনার”, যদিও হতে পারেন বিতর্কিত। আর এই আমরাই তার ভিডিও দেখছি ও শুনছি। তার ভিডিওর ভিউ আমরাই বাড়াচ্ছি, মানে আমরাই তাকে প্রোমৌট করছি। তাহলে আসল অপরাধীটা কে?
ইউটিউবে তো অনেক ভালো মানের ভিডিও আপলৌড হয় তার সবগুলো কি আমাদের নজরে আসে? ফেইসবুকে কতো ভালো ভালো লেখা পৌস্ট হয় তার কয়টি আমরা পড়ি ও অন্যের সঙ্গে শেয়ার করি? অথচ একটু নেগেটিভ কিংবা ব্যতিক্রম কিছু আসলে আমরা সেই বিষয়টি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ি। আর তখনই এই নেগেটিভ বিষয়টি নিয়ে যে পৌস্ট করলো সে মনে করে তার কনটেন্টটি সবার নজরে এসেছে। তাই সেটিকে অনুপ্রেরণা মনে করে সে আরও কনটেন্ট প্রকাশ করে। ঠিক এই জিনিসটিই হয়তো হিরো আলমের ক্ষেত্রে কাজ করেছে।
হিরো আলম আমাদের বারবার দেখিয়ে ও মনে করিয়ে দেয় আমরা জাতি হিসেবে কতোটুকু বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক, পক্ষপাতদুষ্ট ও গোঁড়া। আরও দেখায় আমাদের তথাকথিত “শিক্ষিতদের” যারা সাম্য ও বৈষম্যের কথা বলেন অথচ এক হিরো আলম সংসদে যাওয়ার সম্ভাবনায় তারা হয়েছিলেন ঈর্ষান্বিত আর কুযুক্তিতে বাহ্যাড়ম্বর প্রদর্শন করে দেখিয়েছিলেন তাদের পাণ্ডিত্য ও নীতিবাগীশী।
এই তো বছর দুই আগে, হিরো আলম যখন সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন তখন আমরা বলতে শুরু করলাম ‘হিরো আলমের মতো’ মানুষকে কি আমরা সংসদ সদস্য হিসেবে চাই। তাচ্ছিল্য করে এই ‘মতো’ শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা বুঝিয়ে দিলাম জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে এক সাম্প্রদায়িক বীজ বপন করা আছে। আমরা নিজেরাই বর্ণবাদী। আমরা গ্রামের কালো ও আনস্মার্ট হিরো আলমকে আমাদের সংসদ সদস্য হিসেবে চাই না। অথচ দলবেঁধে ভিন্নদেশে অভিভাসী হয়ে বর্ণবাদের সুবিধা নিয়ে এই আমরাই ঢুকতে চাই তাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। এই আমাদেরই কালো ও তৃতীয় বিশ্বের কেউ যখন ইউরোপ-আমেরিকার নির্বাচনে জয়ী হয় তখন আমরা কতোই না খুশি হই। অথচ আমাদেরকে যখন শ্বেতাঙ্গ কেউ কালো কিংবা ফ্রেশী (আনকোরা) বলে তখন আমরা তাদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের শ্লোগান তুলি। কিংবা যখন সে দেশের ন্যাশনালিস্ট পার্টিগুলো আমাদের মতো অভিভাসীদের আগন্তুক মনে করে তখন সুযোগ পেলে তাদের দেশে তাদেরকেই বর্ণবাদী বলতে দ্বিধা করেন না। বিপরীতে হিরো আলমের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা কেউ যখন নিজ দেশেই জনপ্রতিনিধি হতে চাইলো তখনই পুরো রাষ্ট্রই দেখিয়ে দিলো সে আসলে কতোটুকু এই আমাদের। অথচ শ্রমজীবী হিরো আলমই গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল উদারণ হতে পারতো। আমরা কোনো ঋণখেলাপী, দুর্নীতিবাজ কিংবা অপরাধীর হাতে জনপ্রতিনিধীর দায়িত্ব দিতে রাজি থাকি, কিন্তু পরিশ্রমী স্বপ্নবাজ মজুরের হাতে সেই দায়িত্ব দিতে রাজি নই। আমাদের এই দ্বৈত নীতিই আমাদের সভ্যতার অন্তরায়।
গত সংসদ নির্বাচনের একটা পর্যায়ে তো এমনও খবর প্রকাশিত হয় যেখানে নির্বাচন কমিশনের সচিব বলেছিলেন, ‘হিরো আলমও হাইকোর্ট দেখায়। সেও বলে যে নির্বাচন কমিশনকে আমরা হাইকোর্ট দেখিয়ে ছাড়ছি। বোঝেন অবস্থা!’ আমাদের মনে প্রশ্ন জেগেছিলো, একজন ইসি সচিব “হিরো আলমও” কিংবা “সে” বলতে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন? জনগণের গোলাম হয়ে রাষ্ট্রের গুরু দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রের সেবক কী করে একজন সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীকে তুই-তুকারি করতে পারেন?
অথচ আমরা এসব ভুলে যাই, ভুলে যাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতির কথা। এটি কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী নয়? স্বাধীনতার এতো বছর পরও আমরা আজ নিজেরাই নিজেদের মানুষের ওপরে করছি জুলুম। বাঙালির আত্মপরিচয়ের অন্বেষণের প্রচেষ্টায় ব্রাহ্মণ-শূদ্র, আশরাফ-আতরাফ এসব পার্থক্য থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে কেবল সরে এসেছি কিন্তু আমাদের রক্তে প্রবাহিত “অসুরের” পরিচয়টা সময়ে সময়ে সুশীলের আড়াল থেকে বের হয়ে আসে।
হিরো আলম নিজ দেশেই বর্ণবাদের শিকার হওয়া হাজারো হিরো আলমদের প্রতীক। এ কারণেই ‘হিরো আলমের মতো’ উচ্চারণের মাধ্যমে আমরা আমাদের এক বিশাল শ্রমজীবী সম্প্রদায়কে নিয়ে আসলে উপহাস করি, করি এই শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের প্রতি বৈরী আচরণ আর প্রতিষ্ঠিত করি আমাদের বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক চেতনা। আর এটিই হচ্ছে প্রগতিশীলতার নামে প্রতিক্রিয়াশীলতার গোপন চর্চা যা ভীষণ বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক।
  সৈয়দ রুম্মান :  কবি, সাহিত্য সম্পাদক; সাপ্তাহিক সুরমা, লন্ডন। যুক্তরাজ্য ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

"এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব " -সম্পাদক