রবিবার, ৩ জুলাই ২০২২ খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
বিলেতে কারী শিল্পে ঈদের ছুটি সময়ের দাবি  » «   ঈদের ছুটি  » «   ইউরোপে জ্বালানি সংকট চরমে, বিকল্প ভাবতে হচ্ছে ইউরোপকে  » «   হাইডে প্রবীণদের স্মরণে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল  » «   ঈদের দিন হোক সবার উৎসবের দিন  » «   ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল সিলেটের সার্টিফিকেট বিতরণী অনুষ্ঠিত  » «   নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশী সমিতি’ ইউকে’র যাত্রা শুরু  » «   ব্রিটেন প্রবাসে ঈদ ছুটি নিয়ে ভাবনা ও আমাদের করণীয়  » «   ঈদে ছুটি নাই  » «   কমিউনিটি ও পরিবারের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে ঈদের ছুটি নিয়ে দ্বি-মত থাকবে না- শায়খ আব্দুল কাইয়ুম  » «   ব্রিটেনে ঈদ হলিডে : আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা  » «   দয়া নয়, ঈদের ছুটি শ্রমজীবি মুসলমানদের অধিকার  » «   ব্রিটেনে ঈদের ছুটি নিয়ে কমিউনিটি ও মানবাধিকার নেতারা যা বলেন  » «   বিয়ানীবাজার ক্যান্সার এন্ড জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃক বন্যা দুর্গতদের চিকিৎসার্থে বিনামূল্যে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল ক্যাম্প  » «   যুক্তরাজ্যে ঈদের ছুটির দাবীতে  আলতাব আলী পার্কে সমাবেশ অনুষ্ঠিত  » «  
সাবস্ক্রাইব করুন
পেইজে লাইক দিন


রাষ্ট্রহীন শামিমা এবং বাংলাদেশে নাগরিকত্ব



সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

শামিমা গত চার বছর থেকেই মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছেন। সময়ে সময়ে এই নারী বিশ্ব গণমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছেন। কখনো দাঁড়াচ্ছেন তিনি কাঠগড়ায়, কখনো সারা বিশ্বই তার দিকে ছুড়ে মারছে ঘৃণার পাথর। কারণ শামিমা যোগ দিয়েছিলেন কুখ্যাত আইএসের সহযোগী হিসেবে। ১৫ বছরের স্কুলছাত্রী লন্ডন থেকে পালিয়ে গিয়ে সংযুক্ত হয়েছিলেন আইএসের সঙ্গে। জঙ্গিদের তৈরি ধর্মের ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে হাজার হাজার জঙ্গি সংযুক্ত হয়েছে সে সময়গুলোতে শামিমার মতোই। তারা সবাই-ই ওই উগ্রদের ধর্মীয় ভ্রান্তির আহ্বানে জেহাদ নামের শব্দে উদ্বেলিত হয়েছে। চালিয়েছে নৃশংসতা, যুদ্ধের ময়দানে এরা উন্মাদনা দেখিয়েছে, তাদের নৃশংসতায় সারা পৃথিবীতেই তারা হয়েছে এক ঘৃণিত নাম।

এই আইএস জঙ্গিদের জঙ্গিত্বকে ধর্মীয় লেবাসধারীরা ধর্মের আবরণ দিয়েছে। উদ্বুদ্ধ করেছে এমনকি নারীদের, বিশেষত কিশোরী কিংবা তরুণীদের। যুদ্ধের ময়দানে তাই তো এই মেয়েগুলো সেই জঙ্গিদের যৌন লালসার শিকার হয়েছে। ধর্মের নাম নিয়ে এদের বিয়ে হয়েছে বারবার। যখন তাদের বোধে চেতনা জাগ্রত হয়েছে, তখন তাদের পথ ছিল রুদ্ধ। ফিরে আসার সব দরজা তখন তাদের আর খোলা ছিল না। তারা ফিরতে পারেনি। নিহত হয়েছে অনেকেই। আর যারা থেকেছে ‘অনার এবিউজ’-এর শিকার হয়েছে রাতের পর রাত। তাদেরই একজন শামিমা। শামিমার গল্প ফুরোচ্ছে না। ১৫ বছরের কিশোরী, যাকে ব্রিটেনে টিনএজারদের সারিতে দেখা হয়। যে বয়সে কোনো অপরাধ করলে এমনকি পুলিশ কিছু করতে পারে না, কিশোর আখ্যায়িত করে অনেক বড় বড় অপরাধে এদের সাজা স্থূল হয়ে যায়। অথচ শামিমার বয়সটাকে যেন ব্রিটিশ সরকার কোনো গুরুত্বের চোখেই দেখল না। শুধুই আবেগে ভর করে কিংবা বিকৃত করা ধর্মের হাতছানিতে ১৫ বছরের যে মেয়েটি উদ্বুদ্ধ হলো একটা ঘৃণিত কাজে, সেই কাজটাকেই একটা বিরাট মহিরুহ হিসেবে দেখল ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র বিভাগ। এই কিশোরী যে যৌন লালসার শিকার হয়ে দিনের পর দিন এক ধরনের যৌনদাস হয়ে কাটাল তার কৈশোর সময়, সে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মানবিক বোধটুকু কাজ করল না। অথচ এ বছরের শুরুতে দিকে যখন তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিল, তখন হুট করে ঘোষণাই দিয়ে দিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাবেদ, শামিমার নাগরিকত্ব তোলে নেয়া হলো। অর্থাৎ ব্রিটেনে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে গেল তার। তার পিতার আবাস বাংলাদেশে, তাই তাকে বাংলাদেশ সরকারের দ্বারস্থ হওয়ার এক অযৌক্তিক দায় চাপিয়ে দিতে চাইলেন তিনি। অথচ সে সময়ও ব্রিটেনের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী সরকারের এই সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি, এমনকি বিরোধী দলের নেতা জেরেমি করবিন পর্যন্ত বলেছিলেন, শামিমার বিচার হোক, তবে তার জন্মস্থানে নিয়ে এসেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক তাকে।

ব্রিটিশ হোম সেক্রেটারি সাজিদ জাবেদের সে সময়ের তথ্যানুযায়ী প্রায় ৯০০ ব্রিটিশ নাগরিক আইএসে যোগ দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এরা সিরিয়ায় যুদ্ধ করেছে কিংবা আইএসের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। শুধু ব্রিটেন নয়, আমেরিকারসহ পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের স্থায়ীভাবে বাস করা নাগরিকদের হাজার হাজার মানুষ গেছে সিরিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু শামিমার মতো কিশোরীদের সংখ্যা কত? সেটা তো নিশ্চিত নয়। তবে এ সংখ্যা যে খুব বেশি হবে তা নয়। তবুও শামিমার নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করা হয়েছে।

কিন্তু সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাবেদের সিদ্ধান্তই কি শামিমার জন্য শেষ রায়?- এ প্রশ্নটিই এখন উচ্চারিত হচ্ছে আবারো। আর সেজন্যই এখন শুরু হয়েছে নতুন আইনি লড়াই। ২০ বছরের তরুণী এখন শামিমা, কিন্তু তার ভ্রান্তি শুরু হয়েছে ১৫ বছরের কৈশোর সময়ে। এই ‘টিনএজের’ সময়টা ব্রিটিশদের জন্য এক মানবিক বিবেচনার জায়গাও। আইনের মারপ্যাঁচ তো আরো ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু মানবিক এ জায়গাটাকেও গুরুত্ব দেয়ার ব্যাপার আছে। সেজন্যই জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়টাকে আরো বিচারিক আওতায় এনে সরকারের এ সিদ্ধান্তে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হয়েছে। শামিমার পক্ষ থেকে তার আইনজীবীরা ২২ অক্টোবর তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ওপর আপিল করেছেন লন্ডনের বিশেষ ইমিগ্রেশন অ্যাপিল কমিশনে (Special Immigration Appeals Commission)।

এ আপিল করতে গিয়ে আবারো নাম আসছে বাংলাদেশের। বলা হয়েছে বাংলাদেশে শামিমা ঢুকতে গেলে সেখানেও তিনি ফাঁসিকাষ্টে ঝুলতে পারেন। উল্লেখ্য ব্রিটেন রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো মানুষের ফাঁসিকে সমর্থন করে না। সে কারণে ফাঁসির দড়ি নিয়ে শামিমার বাংলাদেশে প্রবেশের পথ আপাতত রুদ্ধ। শামিমা স্টেটলেস কিংবা রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়ার কথাটি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে যখন শামিমার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব প্রত্যাহার করা হয়, তখন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাবেদ শামিমাকে বাংলাদেশে পাড়ি দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেসময়ই অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, শামিমা কোনোকালেই বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন না, এমনকি শামিমা কোনোদিনই বাংলাদেশে ভ্রমণও করেননি। সুতরাং সে সময়ই ব্যাপারটার সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু গত মঙ্গলবারের পুনর্বিবেচনার বিবেচনা করার আবেদনের পর আবারো বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা আসছে। তার নাগরিকত্ব পুনর্বিবেচনা করা না হলে তিনি রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন। আপিলেই বলা হয়েছে, তার নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে তিনি ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত হয়েও চরম দারিদ্র্যে ক্লিষ্ট হয়ে হতভাগ্যের জীবনকে বরণ করতে বাধ্য করা হবে তাকে। এ অবস্থায় তিনি যেন খাঁচায় বন্দি এক দুর্বিষহ জীবনের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে বাধ্য হবেন।

সাধারণত একজন মানুষ রাষ্ট্রহীন থাকতে পারে না। একজন মানুষ হিসেবে যে কেউ কোনো না কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ারই কথা। তা না হলে মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে যায়। সঙ্গত কারণেই একজন মানুষকে রাষ্ট্রহীন হতে দেয়া উচিত নয়, তবুও এ পৃথিবীতে রাষ্ট্রহীন মানুষের সংখ্যা কম নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অসংখ্য মানুষ শরণার্থীর জীবন কাটাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। যদিও সব শরণার্থী রাষ্ট্রহীন নয়। বাংলাদেশেও আছে দেড় মিলিয়নেরও বেশি রাষ্ট্রহীন মানুষ, যারা কাটাচ্ছে শরণার্থীর রাষ্ট্রহীন জীবন। এভাবেই দেখা যাচ্ছে প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।

কিন্তু শামিমাকে তো রাষ্ট্রহীন করা যাবে না। কারণ ব্রিটেনে রাজনৈতিক ক্রাইসিস নেই, শরণার্থী হওয়ার মতো কোনো প্লট সৃষ্টি হয়নি। শামিমা জন্ম সূত্রে ব্রিটিশ নাগরিক। রাষ্ট্র বলছে তার অপরাধের কারণেই তাকে নাগরিকত্বহীন করা হচ্ছে। পরিণতি হচ্ছে শামিমা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ছেন। যদিও রাষ্ট্র ব্যাখ্যা দিয়েছে তার এ কপাল পোড়ার জন্য শামিমা নিজেই দায়ী, কারণ তিনিই তার এই দুরবস্থার জীবন বেছে নিয়েছেন, তাকে কেউ বাধ্য করেনি। কিন্তু যে বয়সে শামিমা তার দুরবস্থার জীবনের সঙ্গী হয়েছেন, সে সময়টাই তো বিবেচনার। এবং মানবিক দৃষ্টি দিয়েই তা বিবেচনা করার জন্য খোদ ব্রিটেনের মানুষই বলছেন। আর সে জন্যই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যে অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে শামিমা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারের কথা উচ্চারিত হচ্ছে, বাংলাদেশে সে অপরাধকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বব্যাপী এমনকি প্রশংসিতও হচ্ছে। সুতরাং শামিমা এমনিতেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার রাখছেন না, সে হিসেবে বাংলাদেশে অবাঞ্ছিত একজন শামিমাকে বাংলাদেশে ঢোকার অধিকার দিয়ে বাংলাদেশও তার বিচারের বাড়তি দায়ভার নিতে যাবেই বা কেন ?

ফারুক যোশী : কলাম লেখক, প্রধান সম্পাদক; ৫২বাংলাটিভি ডটকম


সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

"এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত ও লেখার দায় লেখকের একান্তই নিজস্ব " -সম্পাদক