মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
https://blu-ray.world/ download movies
সর্বশেষ সংবাদ
ব্রিটেন নির্বাচনে ব্রেক্সিট না মানবিকতা?  » «   ব্রিটিশ-বাংলাদেশী রুশনারা আলী আবারও এমপি হচ্ছেন!  » «   মিয়ানমারকে বয়কটের ঘোষণা ৩০ মানবাধিকার সংস্থার  » «   ভয়েস অব বার্সেলোনার সান্তা কলমা শাখা কমিটি ঘোষনা  » «   ৫২ বাংলা টিভির মধ্যপ্রাচ্য টকশো ‘প্রবাসি সংযোগ’  » «   ১৭ দফা দাবিতে সিপিবি বিয়ানীবাজার উপজেলা শাখার উদ্যোগে পদযাত্রা অনুষ্ঠিত  » «   লালাবাজার ইউনিয়ন এডুকেশন ট্রাষ্ট ইউকে’র সম্মেলন ও নির্বাচন অনুষ্টিত  » «   ব্রিটিশ পার্লামেন্টের দিকেই হাঁটছেন আপসানা বেগম  » «   জিএসসি সাউথ ইস্ট রিজিওনের প্রায় আড়াই হাজার মেম্বারশীপ ফরম জমা  » «   আমিরাতে যুবলীগের নবনির্বাচিত কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে আলোচনা সভা  » «   ওমানে ৫২ বাংলা টিম আমিরাতের মতবিনিময়  » «   জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী: বিশ্বনেতৃবৃন্দের ঐক্যবদ্ধ কাজ করার আহবান  » «   জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে পরিবেশবিদদের সাথে প্রধানমন্ত্রী  » «   ইতালীতে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি  » «   জলবায়ু সম্মেলনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন পরিদর্শন করেন  » «  

বিয়ানীবাজারের ইতিহাসে প্রথম একটি মামলা এবং শেষ হওয়া



এরশাদ বিরোধী আন্দােলনের উত্তাল সময় তখন। আজকের রমরমা বিয়ানীজারের মত অবস্থা তখন নয়। কন্ট্রাকটারী, টেন্ডারবাজীর বড় কোন জায়গা ছিল না।তবে দূর্ণীতি পুরো দস্তর ছিলই।নতুন নতুন উপজেলা ব্যবস্থা তখন সারা দেশে। উপজেলা ম্যাজিষ্ট্রেট, ইউএনও সব মিলিয়ে থানা পর্যায়ে একটা বড় প্রশাসনের সূত্রপাত মূলত সেই আমলেই।আর সেকারনেই নতুন এই ব্যবস্থাকে গণমূখি করতে নতুনভাবে অনুদান আসছে। উপজেলাগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছিল দেদার।স্বাভাবিকভাবে এর ছোয়া লাগে বিয়ানীবাজারেও।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে যেমন একটা গ্রুপ ফুলে-ফেপে উঠার সুযোগ পায়, ঠিক তেমনি সে সুযোগটা তখনও আসে।দালাল-ফড়িয়ারা উপজেলা প্রশাসনের কাছাকাছি ঘুরঘুর করতে থাকে।  নতুন নতুন দালান-কোটা-রাস্তা-কালভার্ট-ব্রিজ প্রভৃতি নির্মাণের জন্য আসতে থাকে অর্থ। বন্যা হয় ঘন ঘন । এরশাদ পানিতে নামছেন, সাইকেল চালাচ্ছেন আর তাঁর মোসাহেবরা বিয়ানীবাজারেও এরশাদের সেই গানটি গেয়ে গেয়েই উপজেলা প্রশাসনের হাতে হাতে হাত মিলে পুকুর চুরির কাজও চালাচ্ছেন।তখন গম আসতো ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ প্রজেক্টগুলো তৈরী হতো। তথনকার অর্থনৈতিক প্রবাহে এলাহি সব কান্ড।

সেসময়েই বিয়ানীজার প্রেসক্লাব থেকে সিদ্ধান্ত হল একটা পত্রিকা প্রকাশের।প্রতিতযশা কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম(প্রয়াত) তখন বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি।স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিক-রিপোর্টারদের আধিক্য ছিল না তখন আজকের মত।এখনকার বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক মুস্তাফিজ শফি (ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সমকাল), খালেদ জাফরী,  আজিজুল পারভেজ (কালের কন্ঠের প্রধান প্রতিবেদক), রনজিৎ চক্রবর্তী,আলী আহমেদ বেবুল প্রমূখ ছিলেন সেমসয়ের প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটিতে । এছাড়া সিনিয়রদের মাঝে ছিলেন প্রয়াত আব্দুল বাছিত, আব্দুর রহিম (শিক্ষক) কবি ফজলুল হক  প্রমূখ।   ‘বিয়ানী বাজার বার্তা’ নাম দিয়েই তখন আমরা পত্রিকাটি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেই।প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক হিসেবে সেসময় পত্রিকাটি সম্পাদনার দায়ীত্বটি পড়ে আমার উপর ।স্বাভাবিকভাবে সম্পাদক হিসেবে আমি এবং প্রেসক্লাবের প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে আজিজুল পারভেজের নাম প্রিন্টার্স লাইনে ছাপা হয়।

গম আর উপজেলার একটা বধ্যভূমিতে বিএডিসি’র ভবন নির্মান নিয়ে একটা প্রতিবেদন ছাপা হয় তখন। বধ্যভূমিটি সংরক্ষনের দাবি ছিল আমাদের।  আজকের উপজেলা কমপ্লেক্সেই খলিল চৌধুরী স্কুলের পাশ ঘেসে ছিল এ বধ্যভূমি। স্বাভাবিকভাবেই কত মানুষের রক্তের দাগ মিলে-মিশে একাকার হযেছিল ঐ মাটিতে।সেজন্যই আমরা চেয়িছিলাম এর সংরক্ষন। অথচ সে সমযে কতিপয় স্বার্থান্বেষীদের কারনে তা-ও শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যায় নি।  আর এসব লেখাগুলোই  পত্রিকার জন্য কাল হয়ে দাড়ায়, আমরা যেন আঁতুড় ঘরেই ঘোঙ্গাতে থাকি।কেন জানি একটা উষ্ন হাওয়া বইতে থাকে  সারা উপজেলায়। হরিলুটের অংশীদার কিছু  জনপ্রতিনিধি আর গম ব্যবসার একচ্ছত্র অধিপতির প্রভাব-অর্থে ‘বিয়ানীবাজার বার্তা’র প্রকাশনার কাজ থমকে যায়।

বিয়ানীবাজার স্কুলের শিক্ষক তমাল সেনের একটা প্রেস(কনক মূদ্রায়ন) ছিল। সেই প্রেসে সিলগালা করা হয়, প্রেসটিতে তালা লাগে। আমাদের পত্রিকা বন্ধ হলে খুব একটা ক্ষতি নেই, আমাদের হারানোর কিছু ছিল না। কারন আমদের দাঁড়াবার জায়গা ছিল। কিন্তু তমাল দা’র জন্য নিজেকে যেন একটা অপরাধী মনে হতে লাগল। আমাদের পত্রিকার জন্য তমান সেনের ভাই শ্যামল সেন বেকার হয়ে পড়লেন। কারন তিনিই এখানে কাজ করতেন। রাতদিন আমাদের সঙ্গ দিতেন, বড় মায়ায় পত্রিকাটি ছাপার কাজ করে দিয়েছিলেন তখন।

গম কেলেকংকারীতে স্বাভাবিকভাবে উপরের হাতগুলোরও ছুতো বেরিয়ে আসে।আর সেকারনেই পত্রিকাটির প্রকাশনার উপর খড়ক নামে।মামলা হয় সম্পাদকের (ফারুক যোশী) উপর। পত্রিকাটির প্রচার-প্রকাশনার দায়ীত্বে থাকায় আজিজুল পারভেজের নামেও ঝুলে মামলা।স্বাভাবিকভাবেই মামলাটা এমন পর্যাযে নিয়ে যাওয়া হয় যে, পুলিশ আমাদের বাড়িতেও তল্লাশি চালাতে থাকে।যদিও এর আগে খবর পাওয়ায় আমরা সিলেটমূখি হয়ে পালিয়ে বেড়াই।মামলা বিষয়ক এরকম অভিগ্গতা আগেও হয়েছে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে এই বিয়ানীবিাজারের জাতীয় পার্টির এমপি প্রার্থী আব্দুল হাছিবের এক সভায় হট্টগোলের কারনে ছাত্র ইউনিয়নের উপজেলা সভাপতি হিসেবে অনেকের সাথে মামলা আমার উপরও হয়েছে এর আগে। উল্লেখ্য যে, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তখন অবৈধ সরকারের ঐ প্রহসনের নির্বাচনের বিরোধীতা করে আসছিল।

উপজেলা কোর্টে তখন আসতেন সিলেট জেলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা এডভোকেট বেদানন্দ ভট্টাচার্য। তাঁর মাধ্যমেই তখন চলতে থাকে আমাদের মামলা। প্রথম শূনানীর দিন এছাড়াও এডভোকেট ভানুলাল চক্রবর্তী, এডভোকেট জালাল উদ্দিন, এডভোকেট মহব্বত খান, সাইদ আহমদ মুমিত স্বপন প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন। আমাদের জামিন পাবার জন্য বিয়ানীজারের অনেক শিক্ষাবিদ-রাজনীতিবিদ চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সময় যোগাযোগ করেছেন এমনকি আমাদের অজান্তেই।আমরা যাতে যে কোন ধরনের সাজা থেকে মুক্ত থাকতে পারি, তার জন্য সেসময়ে  আমাদের আমাদের অগ্গাতেই ম্যাজিষ্ট্রেটের সাথে বিভিন্ন সময় যোগাযোগ করেছেন আমাদের শিক্ষক পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ হাইস্কুলের তৎকালিন প্রধান শিক্ষক জনাব আলী আহমদ।উপজেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদতো আমাদের সাথেই থেকেছে।জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদও বিবৃতি দিয়েছে,  আমাদের বেকসুর খালাস দিতে পথসভায় দাবি তোলেছেন তৎকালিন ছাত্র নেতারা।

যেভাবেই হোক, একদিন উপজেলা ক্যম্পাস ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের শত শত ছাত্রদের পদভারে উত্তাল হয়ে উঠে। ম্যাজিষ্ট্রেট কিছুটা থমকে যান। তারপর তাঁর সেরেস্তাদারের সাথে আলাপে নিশ্চিত হন, আমাদের জামিন নেবার জন্য এদিন বেদানন্দ দা আবেদন করছেন । সত্যি কথা হল, ম্যাজিষ্ট্রেট লোকারন্য  আদালতের দিকে একবার তাকান, আরেকবার  আমাদের দেখেন। কি এক দুদোল্যমানতায় রুদ্ধশ্বাস অবস্থার মধ্যি দিয়ে সেদিন আমাদের জামিন হয়ে যায়।উল্লেখ করতে চাই সেদিন আদালতে উপস্থিত সকল আইনজীবীরা একবাক্যে আমাদের জামিন চেয়ে সায় দিয়েছিলেন। এমনকি আমরা তাদের সবাইকে আমাদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য বলিও নি সেদিন।আমি আজও কৃতগ্গ সেই আইনজবীদের প্রতি, যারা বিনা পারিশ্রমিকে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

তারপর সময় গড়ায়। একসময় মামলার নিস্পত্তি টানার দিন আসে।উপজেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে অনেকেই অনুরোধ  করেছেন আমাদের যেন বেকুসর খালাস দেয়া হয়। কিন্তু বেচারা ম্যাজিষ্ট্রেট !  হরতার নিয়ে তাঁর সাথে আমার একদিনের ঘঠনা যেমন তিনি ভূলতে পারেন নি, তেমনি আমারও আজ পর্যন্ত মনে আছে। তাই এ ‘বেয়াদবী’র প্রতিদান আমি পাবই, এটা তিনি দুএকজনকেও বলেও দিয়েছিলেন সেসময়।এদিকে বেদানন্দ দাকে আমরা নড়াতে পারছি না। বলেছেন ‘আপোস করবো না। দন্ড হতেও দেবো না।’ বিশ-বাইশ বছরের এক তরুন আমি।জীবন-জিবীকায় হন্যে হয়ে ঘুরছি তখন। সামনে পড়ে আছে আমাদের অবারিত আগামী,যা অনিশ্চিত।  সেজন্যই হয়ত অহেতুক মামলায় সাজা পেয়ে জীবনের পণ্জিকায় দাগ লাগাতে দিতে চান না বেদানন্দ দা।

মানসিক একটা সংকটের মাঝে সময়  চলছে তখন । সে সময়ের এক রৌদ্রজ্জল ছুটির দিনে হঠাৎ দাদা (আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম) এসে আমাকে ধরলেন, বললেন যেতে হবে এক জায়গায়।হাঁটছি, বলি কোথায় যাবেন—-এক জায়গায দাঁড়িযে বললেন এই বাসায়। আমি বলি আমিতো যাবো না।নাছোড় বান্দা দাদা। আমাকে না নিয়ে যাবেন না। কিন্তু কথা হল, দাদাও এরকম জায়গায় এর আগে গেছেন বলে মনে হয় নি। কিভাবে যাবেন, কাকেই বা বলবেন। মোবাইলের ব্যবস্থাও ছিল না তখন।তবুও কলিং বেল টিপলেন।বেরিয়ে আসা মানুষটাকে বললেন তোমার সাহেব বাসায় আছেন।পরিচয় না জেনেই ছুটে গেল বাসার অভ্যন্তরে এবং পরে ভেতরে এসে বসতে অনুরোধ জানায়।

কিছুক্ষন পরে আসলেন ম্যাজিষ্ট্রেট । দাদাকে সমীহের সাথে সালাম দিলেন। আমরা কিছু বলার আগেই তাঁর স্ত্রীকে ডেকে এনে  দাদার পরিচয় দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমার দিকে  তির্যক একটা চাহনি দিয়ে তাঁর  স্ত্রীকে আমার পরিচয়টা করিযে দিলেন। আমি বিস্মিত হয়েছি, দাদা তখন আওয়ামী লীগের উপজেলা সভাপতি। অথচ দাপুটে এ পরিচয়টা ছাড়িযে আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে ছিলেন শুধুই একজন প্রেসক্লাব সভাপতি, খ্যাতিমান সাহিত্যিক কিংবা প্রবীন সাংবাদিক হিসেবেই সম্মানীত।

দাদাকে কিছু্ই বলতে হয় নি। ছোটভাইয়ের সাথে যেভাবে আলাপ করতে হয়, সেভাবেই দাদা ম্যাজিষ্ট্রেটের সাথে আলাপ করছিলেন এবং একসময় ম্যাজিষ্ট্রেট আমাকে ছোটভাই বানিয়ে দিয়ে নিজেই মামলার কথা তোললেন।এ মামলায় তাঁর চাপ-সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাপট সবকিছুকে উপেক্ষা করে এ মামলায় তিনি ঝুঁকি নেবেন বলেই জানালেন।শুধু আমাকে একটা অনুরোধ করেছিলেন, মামলা নিস্পত্তির খবরটায় যেন প্রশাসনের নেতিবাচক কোন দিক তোলে না ধরা হয়। তখনই আমরা যা বোঝার বোঝে নিলাম।

এর সপ্তাহদিন পরই ছাত্র-তরুনসহ জনাকীর্ণ উপস্থিতিতে আমাদের এই মামলার রায় হল। খালাসটা আমরা পেলাম, বেকসুর। বেদানন্দ দা ঐদিন ছিলেন না। এডভোকেট স্বপন ভাই’র (প্রয়াত সাইদ আহমদ মুমিত)  মাধ্যমেই এদিন স্বাধীনতা পরবর্তী বিয়ানীজারের ইতিহাসে প্রথম এরকম একটি  মামলার (গণমাধ্যম) সমাপ্তি হয়ে যায়।