বৃহস্পতিবার, ২২ অগাস্ট ২০১৯ খ্রীষ্টাব্দ | ৭ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ
২১ আগস্টের ঘটনা ছিল গভীর নীলনকশার অংশ : রিজভী  » «   বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসনের জন্য কোন রোহিঙ্গা পাওয়া যায় নি  » «   ২১ আগস্ট নিয়ে সংহতি আমিরাতের প্রতিবাদি কবিতার আয়োজন  » «   রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার  » «   শিক্ষার আলো পৌছাতে শিক্ষকের প্রতিদিন ১৮ মাইল ঘোড়ায় চড়া  » «   মাদ্রিদে হবিগঞ্জ এসোসিয়েশন এর আনন্দ ভ্রমণ  » «   কাতালোনিয়া মহিলা সমিতির বনভোজন ও ঈদ পুনর্মিলনী  » «   চামড়া শিল্পের জন্য সহায়ক নীতি প্রয়োজন  » «   উপমহাদেশের এক মহানায়ক হাওরের সন্তান আনন্দমোহন বসু  » «   একশ প্রতিবন্ধীর মুখে হাসি ফুটিয়েছে গোলাপগঞ্জ উপজেলা হেল্পিং হ্যান্ডস ইউকে  » «   চন্দরপুর ফ্রি সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্বনির্ভরতার পথ দেখাবে  » «   বার্মিংহামে কসবা-খাসা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট ইউকে’র প্রীতি সমাবেশ  » «   কাতালোনীয়া সান্তা কলমা আওয়ামী লীগের জাতীয় শোক দিবস পালন  » «   পর্তুগাল আওয়ামী লীগের জাতীয় শোক দিবস  » «   মদিনায় বাস দূর্ঘটনায় নিখোঁজ ১ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে  » «  

হামহামের শীতল স্পর্শে



ঘড়ির অ্যালার্ম বেজে ওঠার আগেই ঘুম ভেঙ্গে গেল সকাল সকাল। দরজার কপাট বন্ধ থাকলেও ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়া আলোতেই আভাস পাওয়া যাচ্ছিল ঝলমলে সকালের। বাইরে এসে দেখি রোদের উজ্জ্বলতায় হাসছে সকাল।
সিলেট থেকে অন্যরা পথ দিয়েছে, ফোনে তা রাফির কাছ থেকে জানার পর প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তবে বিধিবাম! আচমকাই যেন ঝলমলে সকাল হারিয়ে গেল নিকষ কালো মেঘের আঁধারে। শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি আর তুফান।
শহরের এক বারান্দায় আটকে থাকার পর মুক্তি পেলাম প্রায় আধঘন্টা পর। ততক্ষণ চলল তুমুল বৃষ্টি, ঝড় আর মেঘের কড়াৎ কড়াৎ। শ্রীমঙ্গল পৌছার পর কিছু সময়ের ভেতর সিলেট থেকে অন্যরাও চলে আসে। নাস্তা সেরে সবাই একসাথে বেরিয়ে পড়ি।
আপাতত গন্তব্য বিষামনি। সেখানে এক কটেজে আমাদের জন্য অপেক্ষায় ছিল ঢাকা থেকে আসা কয়েকজন। বিষামনির পথে চোখ জুড়ায় টিলায় টিলায় আনারস আর রাবারের বাগান। কটেজে পরিচয় পর্বের পর চড়ে বসি আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকা জীপের ভেতর। সামনের সিটে আমার সাথে রেজা ভাই।
চা বাগানের ভেতর হয়ে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে তারপর লাউয়াছড়া অরণ্য। জীপের চালক রুপক দা জানতে চাইলেন, নুরজাহান চা বাগান না কি ভানুগাছ হয়ে যেতে চাই। চা বাগান হয়ে তুলনামূলক কম সময়ে হামহাম যাওয়া যাবে। তাছাড়া ঐদিকের পথটাও দারুণ- জানার পর একবাক্যে সাড়া দেই। জীপ ডানে মোড় নিয়ে নুরজাহান চা বাগানে প্রবেশ করে।
এই পথটি আসলেই অসাধারণ। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে চলে গেছে উঁচু নিচু সর্পিল পথ। পাহাড়ময় পরিপাটি চা বাগানে চিকচিকে নতুন কুঁড়ি। কোথাও কোথাও বাঁশ আর ছনের ছাউনি দেয়া বিশ্রাম ঘর। পাহাড়ী পথের রোমাঞ্চের সাথে চলতে থাকে হাসি-আনন্দ, গান আর আড্ডাবাজি! পথে পথে পদ্মছড়া, মাধবপুর আর পাত্রখোলা চা বাগান পেছনে ফেলে এসে জীপ থামল কুরমা বাজারে। গ্রাম্য বাজারটিতে কয়েক মিনিটের বিরতির ফাঁকে কিছু শুকনো খাবার আর পানি ট্রাভেল ব্যাগে পুরে আবার রওয়ানা হই। পরের ছ’সাত ঘন্টার জন্য বলা যায় একমাত্র সম্বল। কুরমা বাজার ছাড়ার পর চম্পারাই চা বাগানের কাছে এসে জীপ থেমে গেল।
রুপক দা জানালেন রাতের বৃষ্টিতে কাঁচা রাস্তা খারাপ হয়ে যাওয়ায় গাড়ি আর যাবেনা। এরপর পদযুগলই ভরসা। কলাবন পাড়ার ছোট ছোট শিশুরা বাঁশের লাটি বিক্রির জন্য ট্রেকারদের  অপেক্ষায় ছিল। আমাদের দেখে ছুটে আসে দল বেঁধে। দলের সবার জন্য একটা করে লাটি নেয়া হয়। কলাবন পাড়া থেকে গাইড ইকবাল ভাই আমাদের সাথে যোগ দেন। পাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্রোতসিনী এক ছড়া। তারপরই বন। বনের শুরুতেই বেগুনী ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে হিজল গাছের সারি। যেন আমাদের বরণ করে নেয়ার অপেক্ষায়!
হিজল বনের পরই কাঁটায় ভরা বেতঝোপের দূর্ভেদ্য বুনোট। বনবিট অফিসে নাম এন্ট্রি করে তারপর ঢুকে পড়লাম বনে। শুরুতেই গাইড আমাদের কিছু নির্দেশনা দিয়ে দিলেন। আমাদের ট্রেকিংয়ের শুরু পাহাড়ের গা বেয়ে চলে যাওয়া বুনোপথ ধরে। এই পথই নিয়ে যাবে অরণ্যের গহীনে। ট্রেইলের ওপর গহীন বন ক্রমশ ওপরে ওঠে গেছে উঁচু পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। হাঁটতে হাঁটতে সামনে পড়লো একটি সাঁকো। দুইপাশে আঁড়াআড়ি একটি গাছ ফেলে রাখা। সাঁকো দেখে কয়েক জনের পিলে চমকে যায়। তবে সবার সহযোগিতায় পার হওয়া গেল সহজেই। তারপর পথ আবার ওঠে গেছে পাহাড়ের ওপর দিকে। হাঁটতে হাঁটতে আবার পড়ল সাঁকো। তারপর আবারো! চারটা সাঁকো পার হওয়ার পথ একদম খাড়া হয়ে ওঠে গেছে পাহাড়ের চূড়ায়।
গাছের শেকড়বাকড় ধরে আর লাটির সাহায্যে চূড়ায় ওঠে গেলাম। গাইডের নির্দেশে সবাই একসাথে থামি। তার দেয়া ওষুধ মেশানো ছাই আর কেরোসিন ভাল করে মেখে নিলাম হাতে পায়ে গলায় কাঁধে। হামহামের পথে জঙ্গলের বড় আতঙ্কের নাম জোঁক। জঙ্গলী মশা আর জোঁক থেকে বাঁচাবে এই ওষুধ। আবারো ট্রেইল ধরে পথচলা। একটার পর একটা পাহাড় পেরিয়ে চলতে থাকি। কখনো আপহিল বেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা। কোথাও আবার পিচ্ছিল ডাউনহিল ধরে নিচে নেমে যাওয়া।
পাহাড় চূড়ার একপাশে এক চিলতে ঢাল দিয়ে ট্রেইল গেছে কোথাও। অসাবধানতায় পা একটু হড়কালেই হাজার ফুট নিচের দূর্ভেদ্য বাঁশবন। যেতে যেতে দেখা হয় বন রাঙিয়ে ফুটে থাকা নানা রংয়ের বুনোফুল। পাহাড়ী কলা, বনকাঁঠাল আর বনডুমুরের দেখা মেলে পথে পথে। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর বিশ্রামের জন্য থামলাম সবাই। বিস্কুট আর পানিতে গলা ভিজিয়ে পদযুগলকে জানিয়ে দিলাম, থামলে চলবে না। হামহাম বেড়ানো শেষে ফিরছিল কয়েকজন। তাদের কাছে আর কতদূর জানতে চাইলে উত্তর দিল- সবে তো শুরু! শুনে কিছুটা হতোদ্যম হলেও মনোবলে চিড় ধরলো না।
প্রায় দুই ঘন্টা ট্রেকিংয়ের পর পৌছে গেলাম শেষ পাহাড়টির চূড়ায়। আর ওখান থেকেই প্রথমবার কানে আসে সেই মনমাতানো অপূর্ব স্বর। ঝরনার পতনের শব্দ। এবার ডাউনহিল ধরে নেমে যেতে হবে নিচের ছড়াতে। এই পথটাই সবচে’ ঝুকিপূর্ণ। খাড়া আর পিচ্ছিল। আমাদের সামনের একজন পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোন রকমে বাঁশ ঝাপটে ধরতে পেরেছিল বলে রক্ষে! নিচে নামার পর দেখলাম পাহাড়ী ছড়া বয়ে চলেছে সশব্দে। প্রবল স্রোত। শ্যাওলাধরা বড়সড় পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে সবখানে।
এবার হাঁটতে হবে ছড়া ধরে স্রোতের উজানের দিকে। ঘোলা পানির নিচে কী আছে ঠাহর করার সুযোগ নেই। এখানে হাতের লাটিই যেন অন্ধের যষ্টি! লাটি ঠুকে ঠুকে পানির তলায় পাথর, গর্ত আর পঁচা গাছের ফসিল আন্দাজ করে পা ফেলতে হল। দলের অন্যদের থেকে কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ করেই পিলে চমকে গেল।
আপস্ট্রিমে আচমকা পানকৌড়ির মত পানির ওপর ভেসে ওঠলো কিছু একটার গলা! অবাক দৃষ্টিতে চোখ গোল গোল করে আবিষ্কার করলাম সেটা একটা সাপ! ভয় ছিল স্রোতের তোড়ে যদি ওটা ভেসে আসে। তবে ভাগ্য ভাল। প্রায় পাঁচ ছয় ফুট লম্বা সাপটি ছড়ার পাশে কচুর ঝোপ বেয়ে পাহাড়ের দিকে চলে গেলে হাঁপ ছাড়লাম। ছড়ার শেষদিকে পাহাড়ের বাঁক। সেই বাঁক ঘুরেই আনন্দ আর বিস্ময়ে সজোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম! এ যে রুপসী হামহামের দেখা পাওয়ার উচ্ছাস। একছুটে এবার চলে যাই হামহামের সম্মোহনী সানিধ্যে। সবাই ঝাপিয়ে পড়লাম ঝরনার মায়াবী আহবানে। হামহাম তার হিমশীতল পরশে নিয়ে নিল পথের সবটুকু ক্লান্তি। পানি ছুড়াছুঁড়ি আর জলকেলিতে কাটল কিছু সময়। যেন সবাই চলে গেছি ডানপিটে কৈশোরে!
হামহাম ঝরনার অবস্থান মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কুরমা বনবিটে। প্রায় আট হাজার একর বিস্তৃত বনের গহীনে আছড়ে পড়ছে শত ফুট উচ্চতার প্রসারিত ঝরনাধারা। স্থানীয়দের কাছে ঝরনার অন্য নাম চিতা ঝরনা। এককালে বনের গহীনে নাকি ছিল চিতা বাঘের বিচরণস্থল- তাই এমন নাম। অরণ্যের গহীনে হামহামের শাঁ শাঁ ছন্দ ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোন শব্দই নেই! এক সময় বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। সাথে মেঘের কড় কড়াৎ গর্জন।
গাইডের সর্তকবাণী, অতি বৃষ্টি নামলে ছড়ায় ফ্ল্যাশফ্লাড হতে পারে। তখন আর ফেরা সম্ভব হবে না। রাত কাটাতে হবে এখানেই। সর্তকতা আমলে নিয়ে ছড়ায় নেমে এবার ফেরার পথ ধরলাম। ছড়া পার হয়ে পাহাড়ে ওঠার সময় ভর করল আরেক আতঙ্ক। সকালবেলা পাহাড়ের ট্রেইল শুকনো ছিল বলে জোঁকের উৎপাত ছিলই না। তবে বৃষ্টি হওয়াতে এখন সেই ভয় তাড়া করছে। পথের ওপর ঝুলে থাকা লতা গুল্ম থেকে নয় দশটির মত জোঁক লাটি দিয়ে সরিয়ে দিলাম। তারপরও দুইটা প্যান্টের ওপর চড়ে বসে। শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলাম বলে রক্ষে। হাঁটতে হাঁটতে যেন পথ আর শেষ হচ্ছিল না।
দিনের আলোও নিভে যেতে শুরু করেছে। বনের ভেতর থেকে অচেনা একটা শব্দ শুনতে পাই। গাইড বললেন, এটা তক্ষকের ডাক। অনেক দূর থেকে থেমে থেমে বিলাপ করার মত আরেকটা শব্দ ভেসে আসছিল। অভিজ্ঞ গাইড জানালেন, সম্ভবত কোনো দলছুট বানরের ডাক হবে। আরো বললেন, এই বনে না কি ভালুকও বিচরণ করে। আবছা আলোতে পাহাড়ী পথ পেরিয়ে কলাবন পাড়ায় পা রাখার সময় একদম সন্ধ্যে হয়ে গেছে।
ছড়ার পানিতে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হওয়ার ফাঁকে অন্যরাও ফিরে এলো। পাড়ার একমাত্র রেঁস্তোরায় সবাই খেতে বসলাম। কুপিবাতির টিমটিমে আলোতে আলুভর্তার সাথে দেশী মোরগ আর ডাল দিয়ে খাওয়াটা হলো পেটপুরে। প্রথমবারের মত স্বাদ নেয়া চা পাতার ভর্তাটাও দারুণ ছিল। কলাবন পাড়া থেকে বিদায় নিয়ে জীপের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করার সময় চম্পারাই চা বাগান ঢেকে গেছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে।
ছবিঃ লেখক
লেখক : ভ্রমণ ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক এবং ব্যাংক কর্মকর্তা।