ভোটের আগেই ৪ জনের প্রাণহানি, সারাদেশে ১৪৪ সহিংসতা
- আপডেট সময় : ১১:৪৮:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
- / 10
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে নির্বাচনি সহিংসতা উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। শেরপুরে প্রার্থীদের নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। এই ঘটনাসহ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত চারটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। এরপর থেকে সারাদেশে ২৫টি জেলা ও তিনটি মহানগরের বিভিন্ন থানা এলাকায় মোট ১৪৪টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
এর মধ্যে কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুরে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে চার দফা করে সংঘর্ষ হয়েছে, যা অন্য জেলার তুলনায় সবচেয়ে বেশি। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
পুলিশের হিসাব: ৪৫ দিনে ১৪৪ সহিংসতা
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সংঘটিত ১৪৪টি নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে—
-
প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সংঘর্ষ: ৫৫টি
-
ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণ: ১১টি
-
প্রার্থীর ওপর আক্রমণ: ৬টি
-
অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার: ২টি
-
হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন: ৬টি
-
প্রচারকাজে বাধা: ১৭টি
-
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিসে হামলা/ভাঙচুর/অগ্নিসংযোগ: ৮টি
-
অবরোধ ও বিক্ষোভ: ১০টি
-
সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ: ১টি
-
অন্যান্য ঘটনা: ২৪টি
রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা
শেরপুরের ঘটনার বাইরে আরও তিনটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তথ্য দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে রয়েছে—
-
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, যাকে তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে গুলি করা হয়; তিনি ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
-
২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে জাসাস নেতা ফরিদ সরকার হত্যা।
-
১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক নজরুল ইসলাম হত্যা।
কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ
পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংঘর্ষের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে কুমিল্লা জেলায়। ১৯ জানুয়ারি চৌদ্দগ্রামের সমেশপুর ও তেলিপুকুর এলাকায় জামায়াতের অফিস ও সমর্থকদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়। এর জেরে শুভপুর ও মুন্সীরহাট বাজারে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরদিন ২০ জানুয়ারি উজিরপুরে জামায়াতের উঠান বৈঠকে উসকানিমূলক বক্তব্যের পর বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে চেয়ার, গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর ও একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। আহত হন তিন থেকে চারজন।
এরপর ২২ জানুয়ারি হোমনা পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লা সদরে নির্বাচনি প্রচারণা ঘিরেও সংঘাত ঘটে।
লক্ষ্মীপুরে টানা সংঘর্ষ
কুমিল্লার পর সংঘর্ষের সংখ্যা বেশি লক্ষ্মীপুরে। ১৫ জানুয়ারি চরশাহী ইউনিয়নে জামায়াতের নারী কর্মীদের লিফলেট বিতরণ ও তথ্য সংগ্রহকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরদিন একই এলাকায় আবার সংঘর্ষ ঘটে। এরপর ২২ ও ২৫ জানুয়ারি সদর ও চন্দ্রগঞ্জে ফের সংঘাত হয়, যাতে একাধিক ব্যক্তি আহত হন।
সহিংসতার কারণ ব্যাখ্যা
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন,
“দেশে এ ধরনের সংঘাতের অন্যতম কারণ হলো প্রার্থীদের মধ্যে গণতান্ত্রিক দূরত্ব। অনেক ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগী হিসেবে না দেখে তাকে নাজেহাল না করলে বিজয় নিশ্চিত হবে না—এমন মানসিকতা পোষণ করেন।”
তিনি আরও বলেন, শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হবে।
সরকারের অবস্থান
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন,
“নির্বাচনে কাউকে আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া যাবে না। বেআইনি কাজ করলে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কথায়, কাজে, আচরণে, ঘোষণায় ও বাস্তবায়নে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে হবে।”
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচনি প্রচারণায় সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে কাজ করছে।


















