ঢাকা ০৬:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফর : অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলেনি, ৫ সাফল্য দাবি

৫২ বাংলা
  • আপডেট সময় : ০৪:৩২:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫
  • / 310
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের চারদিনের যুক্তরাজ্য সফর শেষ হয়েছে। ৩৪ জনের এক বহর নিয়ে ৯ থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত চলা এ সফর নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এ সব প্রশ্রের উত্তর মিলেনি। যদিও সফরটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে পাঁচটি সাফল্য দাবি করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ড. ইউনূসের এই সফরকালে শুধুমাত্র শুধুমাত্র হোটেল ভাড়া হিসাব প্রকাশ করে এই ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাষ্ট্রীয় বিমান ব্যবহার না করে বিদেশি উড়োজাহাজ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূস ও তাঁর সফর দল গত ৯ জুন ২০২৫ যুক্তরাজ‍্য সফরে আসেন। তাঁদের অবস্থানের জন্যে লন্ডন শহরের অন‍্যতম ব‍্যয়বহুল দ্যা হোটেল ডরচেস্টারে ৪ রাতের জন্যে যে ৩৭ টি রুম রিজার্ভ করা হয়। তাঁদের হোটেল বিলের একটি কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩৯ জনের সফরদল ৪ রাত অবস্থানের জন্যে ব্যয় করেছে ২১০,৩২৫ ব্রিটিশ পাউন্ড বা প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ( ১ পাউন্ডঃ ১৬৬ টাকা হিসেবে)।
সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল কক্ষ‍ যেখানে অবস্থান করেন প্রধান উপদেষ্টা, সেটি দৈনিক ৬০৪৫ পাউন্ড বা ১০ লক্ষ টাকায় ভাড়া করা হয়। কেবল তার কক্ষেরই বিল আসে ৪০ লক্ষ টাকা বা ২৪,১৮০ পাউন্ড। দেশের সরকার প্রধান অবশ‍্যই বিদেশ সফরে যেতে পারেন, তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা বিবেচনায় যে কোন শীর্ষ হোটেলেই তিনি ও তাঁর দল অবস্থান করতে পারেন। কিন্তু তাঁর এই সফরে বাংলাদেশ কি পেলো বা কিভাবে লাভবান হলো সেটা প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এখানে দ্বিপাক্ষিক কোন বৈঠকের জন্যে আসেননি, সেটা তো নিশ্চিত। ব্রিটিশ রাজার কাছ থেকে ব্যক্তিগত পুরস্কার গ্রহণ করেছেন কেবল। আর আজ (১৩ জুন) বিএনপির শীর্ষ নেতা জনাব তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাত করেছেন। কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে বলেও জানা যায়নি।
এছাড়াও, লন্ডনে বাংলাদেশ বিমানের সরাসরি ফ্লাইট থাকা সত্বেও তিনি ও তাঁর দল ভ্রমণ করেছেন এমিরেইটস এয়ারে, এমিরেইটসের ফার্স্ট ক্লাস ও বিজনেস ক্লাসের ভাড়াও বিমানের তুলনায় বেশি। আর সরকার প্রধান হিসেবে তিনি দেশের ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ারে ভ্রমণ করবেন এমনটাই তো কাম্য?’’

রাষ্ট্রীয় সফর কিনা প্রশ্ন
ড. ইউনূসের এই সফরটি রাষ্ট্রীয় সফর কিনা এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিক আজিজুল পারভেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফর নিয়ে খবরগুলো গুজব নাকি সত্যি?’ শিরোনামে অনেকগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চার দিনের সরকারি সফরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পৌঁছেছেন। ১০ মাসের দায়িত্বপালনকালে এটি তাঁর ১১তম রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফর। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সফরকালে বাকিংহাম প্যালেসে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে দেখা করবেন। এ সময় তিনি রাজা চার্লসের হাত থেকে গ্রহণ করবেন ‘কিংস চার্লস হারমনি অ্যাওয়ার্ড’। এছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা। এরপর বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন ১৩ জুন। প্রধান উপদেষ্টার আগ্রহেই বৈঠকটি হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
যা ঘটলো-
খবর-১: লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার। সেখানে ব্রিটিশ সরকারের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।
খবর-২: ফিনান্সিয়াল টাইমস রিপোর্ট করেছে- ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল ১১ জুন এ বৈঠক হবে।
খবর-৩: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক না হওয়ার কারণ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যে নেই, তিনি কানাডায় গেছেন। পরে জানা গেলো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যেই আছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে যোগ দিয়েছেন।
খবরগুলো সত্যি হলে প্রশ্ন হলো:
১. এটি কি সত্যি রাষ্ট্রীয় সফর? নাকি ব্যাক্তিগত পুরস্কার গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে ব্যক্তিগত সফর? আর রাষ্ট্রীয় সফর হলে প্রটোকল অনুসারে আমাদের সরকারপ্রধানকে রিসিভ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কোনো প্রতিনিধি বিমানবন্দরে এলেন না কেনো? কেনো রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠান, গার্ড অফ অর্নার দেওয়া হলো না?
২. দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠক কি কোনো পূর্বপ্রস্তুতি, পূর্বঘোষণা ছাড়াই করে ফেলা সম্ভব? নাকি এগুলোর জন্য কূটনৈতিক প্রটোকল আছে? নাকি কোনো দেশে চলে গিয়েই বলা যায়, আমরা চলে এসেছি, আসেন বৈঠক করে ফেলি? ঘোষণা দিয়েও বৈঠক করতে না পারার এই যে বেইজ্জতি, এটা কি শুধুই একজন ইউনূস কিংবা একজন সফিকুল আলমের? নাকি রাষ্ট্রের বেইজ্জতি?
৩. একটা রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের রাষ্ট্রীয় সিডিউল আরেক দেশের সরকারের পক্ষে জানা কি অসম্ভব? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দেশে আছেন নাকি কানাডা সফরে গেছেন এই তথ্যটাও কি জানা সম্ভব ছিল না? তাহলে লন্ডনে আমাদের দেশের হাইকমিশন অফিস কী করছে?
৪. ড. ইউনূস ক্ষমতায় এসে কম জনবল নিয়ে বিদেশ সফরের দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এবার কতজন নিয়ে সফরে গেলেন সেটা জানানো হলো না কেনো?
এ সব প্রশ্নের উত্তর কী পাওয়া যাবে?’’

সরকারের দৃষ্টিতে ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরে ৫ অর্জন
চার দিনের যুক্তরাজ্য সফর শেষে শনিবার (১৪ জুন) দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অর্জনের কথা উল্লেখ করে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম। শুক্রবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘‘ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরের অর্জনসমূহ:

১. রাজা চার্লসের কাছ থেকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধানের সঙ্গে ৩০ মিনিটের একান্ত বৈঠক। এটি জুলাই আন্দোলন এবং বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া যুগান্তকারী পরিবর্তনের স্বীকৃতি।

২. অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রধান নেতার সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক বৈঠক। এটাও ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য একটি ‘গেম-ওভার’ মুহূর্ত।

৩. যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক শীর্ষ সহযোগীর ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পদ জব্দ করেছে। এনসিএ কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্পদ জব্দ।
এটি সব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের জন্য একটি বার্তা। এটি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

৪. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (এসিসি) প্রধানসহ বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক। সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য আরও গভীর সহযোগিতার পথ তৈরি করতে এসব বৈঠক হয়েছে।
আশা করা যায়, এই অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী কাজে লাগানো যাবে।

৫. রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ব্যাপারে নতুন আশার সঞ্চার।’’

বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে বিলাতের বৈঠক রাজনৈতিক ট্রাজেডি
বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে বিলাতের বৈঠককে রাজনৈতিক ট্রাজেডি হিসেবে উল্লেখ করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ। ১২ জুন ২০২৫ দৈনিক প্রথম আলোতে তিনি ‘বাংলাদেশ যখন লন্ডনের দিকে তাকিয়ে’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে এ মন্তব্য করেন। তিনি লেখার শুরুতেই লিখেছেন, ‘‘কার্ল মার্ক্স ১৭৩ বছর আগে বলেছিলেন, ইতিহাসে কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেমন ট্র্যাজেডি আকারে হতে পারে, তেমনি প্রহসন রূপেও হয়। বঙ্গের ভাগ্য অতীতেও বহুবার বিলাতে নির্ধারিত হয়েছে। এখন আরেকবার যদি সে রকম হয়, তাকে অন্তত ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবেই শনাক্ত করব আমরা।

ট্র্যাজেডি এটা বহু কারণে। প্রথমত, ঠিক দশ মাস পর গণ–অভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দর-কষাকষির বিষয়ে পরিণত হলো। জনগণ আর সেসবে চালকের আসনে নেই, অন্তত ‘স্থানীয়’ সমাজের সে রকমই পর্যবেক্ষণ।’’

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফর : অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলেনি, ৫ সাফল্য দাবি

আপডেট সময় : ০৪:৩২:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫

অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের চারদিনের যুক্তরাজ্য সফর শেষ হয়েছে। ৩৪ জনের এক বহর নিয়ে ৯ থেকে ১৩ জুন পর্যন্ত চলা এ সফর নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এ সব প্রশ্রের উত্তর মিলেনি। যদিও সফরটিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে পাঁচটি সাফল্য দাবি করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ড. ইউনূসের এই সফরকালে শুধুমাত্র শুধুমাত্র হোটেল ভাড়া হিসাব প্রকাশ করে এই ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রাষ্ট্রীয় বিমান ব্যবহার না করে বিদেশি উড়োজাহাজ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনূস ও তাঁর সফর দল গত ৯ জুন ২০২৫ যুক্তরাজ‍্য সফরে আসেন। তাঁদের অবস্থানের জন্যে লন্ডন শহরের অন‍্যতম ব‍্যয়বহুল দ্যা হোটেল ডরচেস্টারে ৪ রাতের জন্যে যে ৩৭ টি রুম রিজার্ভ করা হয়। তাঁদের হোটেল বিলের একটি কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৩৯ জনের সফরদল ৪ রাত অবস্থানের জন্যে ব্যয় করেছে ২১০,৩২৫ ব্রিটিশ পাউন্ড বা প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ( ১ পাউন্ডঃ ১৬৬ টাকা হিসেবে)।
সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল কক্ষ‍ যেখানে অবস্থান করেন প্রধান উপদেষ্টা, সেটি দৈনিক ৬০৪৫ পাউন্ড বা ১০ লক্ষ টাকায় ভাড়া করা হয়। কেবল তার কক্ষেরই বিল আসে ৪০ লক্ষ টাকা বা ২৪,১৮০ পাউন্ড। দেশের সরকার প্রধান অবশ‍্যই বিদেশ সফরে যেতে পারেন, তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা বিবেচনায় যে কোন শীর্ষ হোটেলেই তিনি ও তাঁর দল অবস্থান করতে পারেন। কিন্তু তাঁর এই সফরে বাংলাদেশ কি পেলো বা কিভাবে লাভবান হলো সেটা প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এখানে দ্বিপাক্ষিক কোন বৈঠকের জন্যে আসেননি, সেটা তো নিশ্চিত। ব্রিটিশ রাজার কাছ থেকে ব্যক্তিগত পুরস্কার গ্রহণ করেছেন কেবল। আর আজ (১৩ জুন) বিএনপির শীর্ষ নেতা জনাব তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাত করেছেন। কোন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে বলেও জানা যায়নি।
এছাড়াও, লন্ডনে বাংলাদেশ বিমানের সরাসরি ফ্লাইট থাকা সত্বেও তিনি ও তাঁর দল ভ্রমণ করেছেন এমিরেইটস এয়ারে, এমিরেইটসের ফার্স্ট ক্লাস ও বিজনেস ক্লাসের ভাড়াও বিমানের তুলনায় বেশি। আর সরকার প্রধান হিসেবে তিনি দেশের ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ারে ভ্রমণ করবেন এমনটাই তো কাম্য?’’

রাষ্ট্রীয় সফর কিনা প্রশ্ন
ড. ইউনূসের এই সফরটি রাষ্ট্রীয় সফর কিনা এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিক আজিজুল পারভেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফর নিয়ে খবরগুলো গুজব নাকি সত্যি?’ শিরোনামে অনেকগুলো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চার দিনের সরকারি সফরে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে পৌঁছেছেন। ১০ মাসের দায়িত্বপালনকালে এটি তাঁর ১১তম রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফর। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সফরকালে বাকিংহাম প্যালেসে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে দেখা করবেন। এ সময় তিনি রাজা চার্লসের হাত থেকে গ্রহণ করবেন ‘কিংস চার্লস হারমনি অ্যাওয়ার্ড’। এছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা। এরপর বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন ১৩ জুন। প্রধান উপদেষ্টার আগ্রহেই বৈঠকটি হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
যা ঘটলো-
খবর-১: লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার। সেখানে ব্রিটিশ সরকারের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না।
খবর-২: ফিনান্সিয়াল টাইমস রিপোর্ট করেছে- ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল ১১ জুন এ বৈঠক হবে।
খবর-৩: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক না হওয়ার কারণ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যে নেই, তিনি কানাডায় গেছেন। পরে জানা গেলো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাজ্যেই আছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে যোগ দিয়েছেন।
খবরগুলো সত্যি হলে প্রশ্ন হলো:
১. এটি কি সত্যি রাষ্ট্রীয় সফর? নাকি ব্যাক্তিগত পুরস্কার গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে ব্যক্তিগত সফর? আর রাষ্ট্রীয় সফর হলে প্রটোকল অনুসারে আমাদের সরকারপ্রধানকে রিসিভ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কোনো প্রতিনিধি বিমানবন্দরে এলেন না কেনো? কেনো রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠান, গার্ড অফ অর্নার দেওয়া হলো না?
২. দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠক কি কোনো পূর্বপ্রস্তুতি, পূর্বঘোষণা ছাড়াই করে ফেলা সম্ভব? নাকি এগুলোর জন্য কূটনৈতিক প্রটোকল আছে? নাকি কোনো দেশে চলে গিয়েই বলা যায়, আমরা চলে এসেছি, আসেন বৈঠক করে ফেলি? ঘোষণা দিয়েও বৈঠক করতে না পারার এই যে বেইজ্জতি, এটা কি শুধুই একজন ইউনূস কিংবা একজন সফিকুল আলমের? নাকি রাষ্ট্রের বেইজ্জতি?
৩. একটা রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের রাষ্ট্রীয় সিডিউল আরেক দেশের সরকারের পক্ষে জানা কি অসম্ভব? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দেশে আছেন নাকি কানাডা সফরে গেছেন এই তথ্যটাও কি জানা সম্ভব ছিল না? তাহলে লন্ডনে আমাদের দেশের হাইকমিশন অফিস কী করছে?
৪. ড. ইউনূস ক্ষমতায় এসে কম জনবল নিয়ে বিদেশ সফরের দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চেয়েছিলেন। এবার কতজন নিয়ে সফরে গেলেন সেটা জানানো হলো না কেনো?
এ সব প্রশ্নের উত্তর কী পাওয়া যাবে?’’

সরকারের দৃষ্টিতে ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরে ৫ অর্জন
চার দিনের যুক্তরাজ্য সফর শেষে শনিবার (১৪ জুন) দেশে ফিরেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অর্জনের কথা উল্লেখ করে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন প্রেস সচিব শফিকুল আলম। শুক্রবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘‘ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরের অর্জনসমূহ:

১. রাজা চার্লসের কাছ থেকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধানের সঙ্গে ৩০ মিনিটের একান্ত বৈঠক। এটি জুলাই আন্দোলন এবং বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া যুগান্তকারী পরিবর্তনের স্বীকৃতি।

২. অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রধান নেতার সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক বৈঠক। এটাও ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য একটি ‘গেম-ওভার’ মুহূর্ত।

৩. যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক শীর্ষ সহযোগীর ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের সম্পদ জব্দ করেছে। এনসিএ কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্পদ জব্দ।
এটি সব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের জন্য একটি বার্তা। এটি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

৪. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (এসিসি) প্রধানসহ বাংলাদেশ ও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারাবাহিক বৈঠক। সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য আরও গভীর সহযোগিতার পথ তৈরি করতে এসব বৈঠক হয়েছে।
আশা করা যায়, এই অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী কাজে লাগানো যাবে।

৫. রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ব্যাপারে নতুন আশার সঞ্চার।’’

বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে বিলাতের বৈঠক রাজনৈতিক ট্রাজেডি
বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে বিলাতের বৈঠককে রাজনৈতিক ট্রাজেডি হিসেবে উল্লেখ করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক আলতাফ পারভেজ। ১২ জুন ২০২৫ দৈনিক প্রথম আলোতে তিনি ‘বাংলাদেশ যখন লন্ডনের দিকে তাকিয়ে’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে এ মন্তব্য করেন। তিনি লেখার শুরুতেই লিখেছেন, ‘‘কার্ল মার্ক্স ১৭৩ বছর আগে বলেছিলেন, ইতিহাসে কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেমন ট্র্যাজেডি আকারে হতে পারে, তেমনি প্রহসন রূপেও হয়। বঙ্গের ভাগ্য অতীতেও বহুবার বিলাতে নির্ধারিত হয়েছে। এখন আরেকবার যদি সে রকম হয়, তাকে অন্তত ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবেই শনাক্ত করব আমরা।

ট্র্যাজেডি এটা বহু কারণে। প্রথমত, ঠিক দশ মাস পর গণ–অভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত দর-কষাকষির বিষয়ে পরিণত হলো। জনগণ আর সেসবে চালকের আসনে নেই, অন্তত ‘স্থানীয়’ সমাজের সে রকমই পর্যবেক্ষণ।’’