ঢাকা ০১:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

সরপঞ্চ প্রথা ও একজন মো: ফরিজ আলী সরপঞ্চ

ছরওয়ার আহমদ
  • আপডেট সময় : ১০:৩৯:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 673
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সার্কেল বা সরপঞ্চ পদ্ধতি হলো ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় সরকারের প্রাচীনতম শাসনব্যবস্থা। প্রাচীন ভারতের গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল পাঁচজন নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠান পঞ্চায়েত। এই প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত ছিল গ্রামগুলির প্রশাসন, আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ও শালিসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং উন্নয়ন ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব। মোগল আমল পর্যন্ত ভারতের গ্রামগুলি এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের এই সুমহান ঐতিহ্যশালী শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। তার বদলে ভারতে ব্রিটিশরা নিজ কায়েমি স্বার্থ টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ভারতের গ্রাম ও নগরাঞ্চলে ব্রিটিশ ধাঁচের এক স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

১৮৫৭ সালের পরে ব্রিটিশরা পঞ্চায়েতকে ছোটোখাটো অপরাধ দমন এবং গ্রামের বিরোধ নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা দিয়ে প্রথাটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। তবে এই পদক্ষেপগুলো গ্রামীণ সম্প্রদায়ের হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত ছিল না।

প্রতিটি প্রশাসনিক থানা অনেকগুলো সার্কেলে বিভক্ত ছিল। সার্কেলের প্রধান নির্বাহীকে বলা হতো সরপঞ্চ। সরপঞ্চের পরিষদে সার্কেলের আকার বা আয়তন অনুসারে তিন থেকে চারজন সরপঞ্চায়েত বা সহকারী সরপঞ্চ থাকতেন। সার্কেলের সরপঞ্চ ও সহকারী সরপঞ্চরা বেশ কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন। চৌকিদার নিয়োগ, কর আদায়, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি, বিচার-শালিশ তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি। থানা সার্কেল অফিসার বা প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে সরাসরি হাত তোলার মাধ্যমে সরপঞ্চ ও সহকারী সরপঞ্চ বা সরপঞ্চায়েত নির্বাচিত হতেন।

সরপঞ্চ দুজন চৌকিদার নিয়োগ করতে পারতেন। ক্ষেত্রবিশেষে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে সরপঞ্চ নিজস্ব ক্ষমতাবলে ৪/৫ জন ব্যক্তিকে শালিশ কার্যে নিয়োগ করতে পারতেন। সরপঞ্চের মেয়াদ ছিল তিন বছর। সরপঞ্চ পদটি বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা।

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সার্কেল প্রথা বিলুপ্ত করে মৌলিক গণতন্ত্র চালুর মাধ্যমে ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠন করেন। ব্রিটিশ শাসনামলে বিয়ানীবাজার থানায় (বর্তমান উপজেলা) ৪১টি সার্কেল ছিল, তার মধ্যে ২৮ নং সার্কেলের সরপঞ্চ ছিলেন মো. ফরিজ আলী।

মো. ফরিজ আলীর জন্ম সিলেট জেলার বর্তমান বিয়ানীবাজার উপজেলার মোল্লাপুর গ্রামের আব্দুল বাকীর গোত্রে (বাকির গোষ্ঠী)। তাঁর পিতা রশিদ আলী। বসতবাড়ি ছোটো মোল্লাপুর মৌজার ৫৯১ দাগে, যেখানে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মরা বর্তমান। তিনি পরপর দুই মেয়াদে সরপঞ্চের দায়িত্ব পালন করেন।

অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন তিনি। দায়িত্বকালীন সময় তাঁর অধীনে থাকা সার্কেলের প্রায় সকল শালিশ বৈঠক হতো তাঁর বাড়ির সামনে থাকা টঙ্গি ঘরে (বাংলো ঘর)। ঐতিহ্যবাহী এই টঙ্গি ঘরটি একসময় এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অবদান রাখে। এই ঘরটি ১৯৯০ সালে ভেঙে পড়লে তা আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

মো. ফরিজ আলী প্রথম বিবাহ করেন বিয়ানীবাজার উপজেলার সারপার গ্রামে। তাঁর স্ত্রীর নাম জানা যায়নি। তাঁর দুই পুত্র ইয়াকুব আলী, ইউসুফ আলী ও দুই কন্যা ছিল। এদের জন্মের পর তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা গ্রামে পূর্বপার (আলীগড়ীর বাড়ি)। দ্বিতীয় বিবাহে তাঁর কোনো সন্তান ছিল না।

সমাজহিতৈষী এই পুরুষ ইহলোক ত্যাগ করেন ১৩৫০ বাংলা সনে (ইংরেজি ১৯৪৩ সাল)। তাঁকে সমাহিত করা হয় মোল্লাপুর গ্রামে তাঁর গোত্রীয় আব্দুল বাকীর কবরস্থানে।

ফরিজ আলী সরপঞ্চ হিসেবে এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ২০২৫ সালে ‘দেওয়ান মনসুর এস্টেট ফান্ড ট্রাস্ট’-এর পক্ষ থেকে মরণোত্তর সম্মাননা স্মারক, ২০২৫ প্রদান করা হয়।

তথ্যসূত্র:

১.মতিয়ার চৌধুরী। স্থানীয় সরকারের সার্কেল পঞ্চায়েত সরপঞ্চ। প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫, পৃষ্ঠা ১০, ১৫, ১৬।

২. সিরাজ উদ্দীন আহমদ, (প্রকৌশলী)। বর্তমান বয়স ৯১, পিতা – ফরজমন্দ আলী, গ্রাম – মোল্লাপুর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৫ জানুয়ারি ২০২৬।

৩. আলাউদ্দিন আহমদ,  (ডাক্তার)। বর্তমান বয়স ৯০, পিতা – ফরজমন্দ আলী, গ্রাম – মোল্লাপুর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪।

লেখক: ছরওয়ার আহমদ
সাবেক ভিপি, বিয়ানীবাজার সরকারি মহাবিদ্যালয় (১৯৯৫), হেড অব কমিউনিটি অ্যাফেয়ার্স ৫২বাংলা টিভি, যুক্তরাজ্য ।
২১ জানুয়ারি ২০২৬ লন্ডন।

নিউজটি শেয়ার করুন

সরপঞ্চ প্রথা ও একজন মো: ফরিজ আলী সরপঞ্চ

আপডেট সময় : ১০:৩৯:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

সার্কেল বা সরপঞ্চ পদ্ধতি হলো ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় সরকারের প্রাচীনতম শাসনব্যবস্থা। প্রাচীন ভারতের গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল পাঁচজন নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠান পঞ্চায়েত। এই প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত ছিল গ্রামগুলির প্রশাসন, আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ও শালিসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং উন্নয়ন ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব। মোগল আমল পর্যন্ত ভারতের গ্রামগুলি এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থা দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাটি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের এই সুমহান ঐতিহ্যশালী শাসনব্যবস্থার সম্পূর্ণ অবসান ঘটে। তার বদলে ভারতে ব্রিটিশরা নিজ কায়েমি স্বার্থ টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ভারতের গ্রাম ও নগরাঞ্চলে ব্রিটিশ ধাঁচের এক স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

১৮৫৭ সালের পরে ব্রিটিশরা পঞ্চায়েতকে ছোটোখাটো অপরাধ দমন এবং গ্রামের বিরোধ নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা দিয়ে প্রথাটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। তবে এই পদক্ষেপগুলো গ্রামীণ সম্প্রদায়ের হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত ছিল না।

প্রতিটি প্রশাসনিক থানা অনেকগুলো সার্কেলে বিভক্ত ছিল। সার্কেলের প্রধান নির্বাহীকে বলা হতো সরপঞ্চ। সরপঞ্চের পরিষদে সার্কেলের আকার বা আয়তন অনুসারে তিন থেকে চারজন সরপঞ্চায়েত বা সহকারী সরপঞ্চ থাকতেন। সার্কেলের সরপঞ্চ ও সহকারী সরপঞ্চরা বেশ কিছু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন। চৌকিদার নিয়োগ, কর আদায়, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি, বিচার-শালিশ তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি। থানা সার্কেল অফিসার বা প্রশাসনিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে সরাসরি হাত তোলার মাধ্যমে সরপঞ্চ ও সহকারী সরপঞ্চ বা সরপঞ্চায়েত নির্বাচিত হতেন।

সরপঞ্চ দুজন চৌকিদার নিয়োগ করতে পারতেন। ক্ষেত্রবিশেষে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে সরপঞ্চ নিজস্ব ক্ষমতাবলে ৪/৫ জন ব্যক্তিকে শালিশ কার্যে নিয়োগ করতে পারতেন। সরপঞ্চের মেয়াদ ছিল তিন বছর। সরপঞ্চ পদটি বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা।

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সার্কেল প্রথা বিলুপ্ত করে মৌলিক গণতন্ত্র চালুর মাধ্যমে ইউনিয়ন কাউন্সিল গঠন করেন। ব্রিটিশ শাসনামলে বিয়ানীবাজার থানায় (বর্তমান উপজেলা) ৪১টি সার্কেল ছিল, তার মধ্যে ২৮ নং সার্কেলের সরপঞ্চ ছিলেন মো. ফরিজ আলী।

মো. ফরিজ আলীর জন্ম সিলেট জেলার বর্তমান বিয়ানীবাজার উপজেলার মোল্লাপুর গ্রামের আব্দুল বাকীর গোত্রে (বাকির গোষ্ঠী)। তাঁর পিতা রশিদ আলী। বসতবাড়ি ছোটো মোল্লাপুর মৌজার ৫৯১ দাগে, যেখানে তাঁর পরবর্তী প্রজন্মরা বর্তমান। তিনি পরপর দুই মেয়াদে সরপঞ্চের দায়িত্ব পালন করেন।

অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন তিনি। দায়িত্বকালীন সময় তাঁর অধীনে থাকা সার্কেলের প্রায় সকল শালিশ বৈঠক হতো তাঁর বাড়ির সামনে থাকা টঙ্গি ঘরে (বাংলো ঘর)। ঐতিহ্যবাহী এই টঙ্গি ঘরটি একসময় এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে অবদান রাখে। এই ঘরটি ১৯৯০ সালে ভেঙে পড়লে তা আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

মো. ফরিজ আলী প্রথম বিবাহ করেন বিয়ানীবাজার উপজেলার সারপার গ্রামে। তাঁর স্ত্রীর নাম জানা যায়নি। তাঁর দুই পুত্র ইয়াকুব আলী, ইউসুফ আলী ও দুই কন্যা ছিল। এদের জন্মের পর তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হলে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন বিয়ানীবাজার উপজেলার মাথিউরা গ্রামে পূর্বপার (আলীগড়ীর বাড়ি)। দ্বিতীয় বিবাহে তাঁর কোনো সন্তান ছিল না।

সমাজহিতৈষী এই পুরুষ ইহলোক ত্যাগ করেন ১৩৫০ বাংলা সনে (ইংরেজি ১৯৪৩ সাল)। তাঁকে সমাহিত করা হয় মোল্লাপুর গ্রামে তাঁর গোত্রীয় আব্দুল বাকীর কবরস্থানে।

ফরিজ আলী সরপঞ্চ হিসেবে এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ২০২৫ সালে ‘দেওয়ান মনসুর এস্টেট ফান্ড ট্রাস্ট’-এর পক্ষ থেকে মরণোত্তর সম্মাননা স্মারক, ২০২৫ প্রদান করা হয়।

তথ্যসূত্র:

১.মতিয়ার চৌধুরী। স্থানীয় সরকারের সার্কেল পঞ্চায়েত সরপঞ্চ। প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫, পৃষ্ঠা ১০, ১৫, ১৬।

২. সিরাজ উদ্দীন আহমদ, (প্রকৌশলী)। বর্তমান বয়স ৯১, পিতা – ফরজমন্দ আলী, গ্রাম – মোল্লাপুর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৫ জানুয়ারি ২০২৬।

৩. আলাউদ্দিন আহমদ,  (ডাক্তার)। বর্তমান বয়স ৯০, পিতা – ফরজমন্দ আলী, গ্রাম – মোল্লাপুর। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪।

লেখক: ছরওয়ার আহমদ
সাবেক ভিপি, বিয়ানীবাজার সরকারি মহাবিদ্যালয় (১৯৯৫), হেড অব কমিউনিটি অ্যাফেয়ার্স ৫২বাংলা টিভি, যুক্তরাজ্য ।
২১ জানুয়ারি ২০২৬ লন্ডন।