ঢাকা ০৮:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রবাসীদের দাবিতে সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বাঁচাতে বিএনপির উদ্যোগ ৬২টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী ৭২ জন  কাকরদিয়া- তেরাদল- আলিপুর এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু জামায়াত আমির বললেন, গালে হাত দিয়ে বসে থাকব না, গর্জে উঠব পাঁচ লাখ অভিবাসীকে বৈধ করবে স্পেন পৃথিবীতে জালিয়াতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ: প্রধান উপদেষ্টা পুরস্কার ঘোষণা করে কী লাভ হলো? লুটের অস্ত্র অপরাধীদের হাতে, নির্বাচন ঘিরে ‘বাড়তি উদ্বেগ’ পে স্কেল নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সরকারি কর্মচারীরা যুক্তরাজ্যে ‘অতিদারিদ্র্যে’ রেকর্ডসংখ্যক মানুষ, তালিকায় বাংলাদেশিরাও ভোট দিয়ে ফেলেছেন ৪ লাখ প্রবাসী

রিফর্মের উত্থানে ইংল্যান্ডের ভোট রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের নতুন হিসাব-নিকাশ?
ইউগভ-এর সমীক্ষা

৫২ বাংলা
  • আপডেট সময় : ০৯:১৯:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫
  • / 315
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ব্রিটিশ রাজনীতিতে উত্থান-পতনের এক চমকপ্রদ পূর্বাভাস দিয়েছে ইউগভ। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই সমীক্ষা ঘিরে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। জরিপে বলা হয়েছে, যদি এখনই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দল সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেতে পারে। হাউস অব কমন্সের ৬২৫টি আসনের মধ্যে দলটি ২৭১টিতে বিজয়ী হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে—যা লেবার পার্টির সম্ভাব্য ১৭৮ আসনের তুলনায় অনেক বেশি এবং কনজারভেটিভদের (৪৬টি আসন) তুলনায় ছয়গুণেরও বেশি।

এই অপ্রত্যাশিত পূর্বাভাস শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিতই দেয় না, বরং লন্ডনের বহুজাতিক অভিবাসী সমাজে, বিশেষ করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ও মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমানে লন্ডনে লেবার পার্টির হয়ে নির্বাচিত চারজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারী এমপি আছেন। তাঁরা হলেন রুশনারা আলী (বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো), আপসানা বেগম (পপলার অ্যান্ড লাইমহাউজ), রূপা হক (ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন) এবং টিউলিপ সিদ্দিক (হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট)। ঐতিহাসিকভাবে এই আসনগুলো লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হলেও, ইউগভের জরিপ অনুযায়ী রিফর্ম ইউকের উত্থানে এসব আসনেও চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬ লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫ জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বসবাস করেন, যাঁদের অধিকাংশের বাস লন্ডনেই। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল এলাকাতেই বাংলাদেশিরা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এতদিন ধরে এই বিশাল ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করেই টিকে ছিল লেবার পার্টি। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে সেই ভিত্তি এখন আর আগের মতো স্থির নয়।

সম্প্রতি এমপি আপসানা বেগম একটি বিতর্কিত সংশোধনীতে দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় হুইপ হারিয়েছেন। তিনি শিশু ভাতা বিষয়ক বিতর্কে বিবেকের পক্ষ নিয়েছিলেন। এতে তার ভবিষ্যৎ দলীয় মনোনয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদি তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, তবে লেবার ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্ব লন্ডনে অতীতেও দেখা গেছে—বাংলাদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীরা একই আসনে দাঁড়িয়ে প্রগতিশীল ভোট ভাগাভাগি করেছেন, যার ফলে রিফর্ম ইউকের মতো দলের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গাজায় যুদ্ধ, ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও অভিবাসন বিষয়ে লেবার এবং কনজারভেটিভ উভয় দলকেই এখন অনেক মুসলিম ভোটার নেতিবাচক চোখে দেখছেন। পূর্ব লন্ডনের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী সেই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে সাফল্য পেয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে রিফর্ম ইউকে একটি নতুন কৌশলের দিকে এগোচ্ছে—তারা এখন এমন মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় পটভূমির প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে চায়, যারা অভিবাসী সমাজের অসন্তোষকে কাজে লাগাতে পারবেন। মুসলিম রাজনীতিক জিয়া ইউসুফকে দলের সাবেক চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত সেই কৌশলের অংশ। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ব লন্ডনের মতো এলাকায় এবার রিফর্ম ইউকে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বা মুসলিম প্রার্থীকে সামনে রেখে সমর্থন বাড়াতে চায়।

রিফর্ম ইউকে অভিবাসন সীমিতকরণের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা ‘নেট জিরো অভিবাসন’ নীতির কথা বলছে—যার মানে হলো আগত ও বহির্গামী অভিবাসীর সংখ্যা সমান রাখতে হবে। এর ফলে দক্ষ কর্মী, পরিবার পুনর্মিলন এবং আন্তর্জাতিক ছাত্রদের প্রবেশে কড়াকড়ি আসবে।

এই নীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আগতরা। ২০২৩ সালে লন্ডনে নিট অভিবাসনের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার, যার বড় অংশ এসেছেন ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে। রিফর্ম ইউকের অবস্থানে এই প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিফর্ম ইউকের উত্থান ব্রিটিশ রাজনীতির পরিপার্শ্ব পাল্টে দিতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে লেবারপন্থী অনেক এলাকার ভোটাররাই এখন বিভ্রান্ত। জাতিগত ও অভিবাসী ভোটারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ইউগভের পূর্বাভাস যদি বাস্তব হয়, তবে এটি শুধু দলগত পালাবদল নয়, বরং ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে।

২০২৫ সালে, অথবা পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়— এটি হতে পারে ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিচয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার সূচনা। বিশেষত, ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য এটি হবে নিজেদের অবস্থান পুনঃসংজ্ঞায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

রিফর্মের উত্থানে ইংল্যান্ডের ভোট রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের নতুন হিসাব-নিকাশ?
ইউগভ-এর সমীক্ষা

আপডেট সময় : ০৯:১৯:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫

ব্রিটিশ রাজনীতিতে উত্থান-পতনের এক চমকপ্রদ পূর্বাভাস দিয়েছে ইউগভ। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই সমীক্ষা ঘিরে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। জরিপে বলা হয়েছে, যদি এখনই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দল সবচেয়ে বেশি আসনে জয় পেতে পারে। হাউস অব কমন্সের ৬২৫টি আসনের মধ্যে দলটি ২৭১টিতে বিজয়ী হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে—যা লেবার পার্টির সম্ভাব্য ১৭৮ আসনের তুলনায় অনেক বেশি এবং কনজারভেটিভদের (৪৬টি আসন) তুলনায় ছয়গুণেরও বেশি।

এই অপ্রত্যাশিত পূর্বাভাস শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিতই দেয় না, বরং লন্ডনের বহুজাতিক অভিবাসী সমাজে, বিশেষ করে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ও মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে।

বর্তমানে লন্ডনে লেবার পার্টির হয়ে নির্বাচিত চারজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নারী এমপি আছেন। তাঁরা হলেন রুশনারা আলী (বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো), আপসানা বেগম (পপলার অ্যান্ড লাইমহাউজ), রূপা হক (ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন) এবং টিউলিপ সিদ্দিক (হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট)। ঐতিহাসিকভাবে এই আসনগুলো লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি হলেও, ইউগভের জরিপ অনুযায়ী রিফর্ম ইউকের উত্থানে এসব আসনেও চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬ লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫ জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বসবাস করেন, যাঁদের অধিকাংশের বাস লন্ডনেই। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল এলাকাতেই বাংলাদেশিরা মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এতদিন ধরে এই বিশাল ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করেই টিকে ছিল লেবার পার্টি। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে সেই ভিত্তি এখন আর আগের মতো স্থির নয়।

সম্প্রতি এমপি আপসানা বেগম একটি বিতর্কিত সংশোধনীতে দলীয় সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দেওয়ায় হুইপ হারিয়েছেন। তিনি শিশু ভাতা বিষয়ক বিতর্কে বিবেকের পক্ষ নিয়েছিলেন। এতে তার ভবিষ্যৎ দলীয় মনোনয়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদি তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, তবে লেবার ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পূর্ব লন্ডনে অতীতেও দেখা গেছে—বাংলাদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীরা একই আসনে দাঁড়িয়ে প্রগতিশীল ভোট ভাগাভাগি করেছেন, যার ফলে রিফর্ম ইউকের মতো দলের জন্য সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গাজায় যুদ্ধ, ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ও অভিবাসন বিষয়ে লেবার এবং কনজারভেটিভ উভয় দলকেই এখন অনেক মুসলিম ভোটার নেতিবাচক চোখে দেখছেন। পূর্ব লন্ডনের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী সেই ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে সাফল্য পেয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে রিফর্ম ইউকে একটি নতুন কৌশলের দিকে এগোচ্ছে—তারা এখন এমন মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় পটভূমির প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে চায়, যারা অভিবাসী সমাজের অসন্তোষকে কাজে লাগাতে পারবেন। মুসলিম রাজনীতিক জিয়া ইউসুফকে দলের সাবেক চেয়ারম্যান করার সিদ্ধান্ত সেই কৌশলের অংশ। ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ব লন্ডনের মতো এলাকায় এবার রিফর্ম ইউকে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি বা মুসলিম প্রার্থীকে সামনে রেখে সমর্থন বাড়াতে চায়।

রিফর্ম ইউকে অভিবাসন সীমিতকরণের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা ‘নেট জিরো অভিবাসন’ নীতির কথা বলছে—যার মানে হলো আগত ও বহির্গামী অভিবাসীর সংখ্যা সমান রাখতে হবে। এর ফলে দক্ষ কর্মী, পরিবার পুনর্মিলন এবং আন্তর্জাতিক ছাত্রদের প্রবেশে কড়াকড়ি আসবে।

এই নীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আগতরা। ২০২৩ সালে লন্ডনে নিট অভিবাসনের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার, যার বড় অংশ এসেছেন ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে। রিফর্ম ইউকের অবস্থানে এই প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রিফর্ম ইউকের উত্থান ব্রিটিশ রাজনীতির পরিপার্শ্ব পাল্টে দিতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে লেবারপন্থী অনেক এলাকার ভোটাররাই এখন বিভ্রান্ত। জাতিগত ও অভিবাসী ভোটারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ইউগভের পূর্বাভাস যদি বাস্তব হয়, তবে এটি শুধু দলগত পালাবদল নয়, বরং ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে।

২০২৫ সালে, অথবা পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়— এটি হতে পারে ব্রিটেনের রাজনৈতিক পরিচয় পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার সূচনা। বিশেষত, ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের জন্য এটি হবে নিজেদের অবস্থান পুনঃসংজ্ঞায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন।