ঢাকা ১০:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মুক্তি পেয়েই হাসপাতাল থেকে শাহবাগে আজহার; বললেন, ‘আমি এখন স্বাধীন’

৫২ বাংলা
  • আপডেট সময় : ০৩:১২:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ মে ২০২৫
  • / 341
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম মুক্তি পাওয়ার পরপরই ঢাকার শাহবাগ মোড়ে উপস্থিত হয়ে নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর চিকিৎসার জন্য তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে। বুধবার (২৮ মে ২০২৫) সকালে আপিল বিভাগের রায়ের পরপরই তাকে হাসপাতাল থেকেই মুক্তি দেওয়া হয়।

মুক্তি পাওয়ার পর একটি গাড়িতে করে শাহবাগ মোড়ে যান আজহার। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তার জন্য সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এই শাহবাগেই ২০১৩ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় এসেছিল।

বুধবার শাহবাগ মোড়ে পূর্বমুখী মঞ্চে ফুল দিয়ে আজহারের স্বাগত জানান জামায়াত নেতারা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, টুপি ও চশমা পরা আজহার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “প্রায় ১৪ বছর কারাগারে থাকার পর আজ আমি মুক্ত। আজ আমি স্বাধীন। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক আমি এখন।”

২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, অপহরণ, হত্যা ও নির্যাতনের ছয়টি ঘটনায় আজহারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের সেই রায় বহাল রাখে।

রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর ২০২০ সালের ১৯ জুলাই তিনি পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্যেই মঙ্গলবার আপিল বিভাগ সেই রিভিউ শুনানি শেষে আজহারের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে মুক্তির আদেশ দেয়।

আজহার বলেন, “মহামান্য আদালতকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, তারা ন্যায়বিচার করেছেন। এতদিন ন্যায়বিচার ছিল না। আদালতকে ব্যবহার করা হয়েছে। আশা করি, সামনের দিনগুলোতে আদালত জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন।”

আইনজীবীদের ধন্যবাদ জানানোর পর তিনি ৩৬ জুলাই ও ৫ আগস্টের আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের কৃতজ্ঞতা জানান।

তিনি বলেন, “ধন্যবাদ যাদের কারণে আজ আমি মুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, সেই ৩৬ জুলাইয়ের, ৫ আগস্টের মহান বিপ্লবের নায়কদের। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আন্দোলনে স্বৈরাচার-ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হতে বাধ্য হয়েছিল। ধন্যবাদ জানাই ছাত্রসমাজকে, ছাত্রসমাজই রাজপথে রক্ত ঢেলে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছিল, যার কারণে নতুনভাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেতে পেরেছে।”

সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী জনগণের পক্ষ নেওয়ায় আজ আমরা এই অবস্থানে আসতে পেরেছি।”

আওয়ামী লীগের শাসনকালে যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন আজহার।

তিনি বলেন, জামায়াতের শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মো. মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, মো. কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী — এদের সবাইকে ‘শহীদ’ করা হয়েছে। তাদের ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ করা হয়েছে।

“এই হত্যাকাণ্ডে যারা যে পর্যায়ে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক। এটা আমি জোর গলায় বলতে চাই। না হলে এই খারাপ সংস্কৃতি চালু থাকবে।”

সমাবেশে জানানো হয়, সেখান থেকে আজহারকে মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

প্রায় আধা ঘণ্টার এ সমাবেশে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বক্তব্য রাখেন। সঞ্চালক তাকে ‘স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের’ নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। উত্তরে শফিকুর রহমান বলেন, “এখানে বলা হয়েছে আমার নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে, মোটেই না। এদেশের ১৮ কোটি মজলুম মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায় সরকারের পতন হয়েছে। আমরা এই মূল ক্রেডিট আল্লাহকে দিই, জমিনের ক্রেডিট এই দেশের জনগণকে দেওয়ার পক্ষে।”

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে। তাতে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা অধিকাংশই বিচারের আওতায় আসেন।

২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায়ে জামায়াতের সাবেক নেতা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরের মাসে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তার রায়ের পর গড়ে ওঠে শাহবাগ আন্দোলন, যার প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকেও আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়। পরে আপিলে কাদের মোল্লার দণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় আপিলে কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আজহারই প্রথম খালাস ও মুক্তি পেলেন। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তিনি কারাবন্দি ছিলেন।

১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্র সংঘের রংপুর জেলা সভাপতি হিসেবে আল-বদর বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার ছিলেন আজহার। তার নেতৃত্বে গঠিত ৭০ জন সদস্যের বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পত্রপত্রিকায় তার আল-বদর বাহিনীর সভা-সমাবেশে নেতৃত্ব দেওয়ার খবরও রয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর ইসলামী ছাত্র শিবির গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর জামায়াত ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসেন।

রংপুরে সংঘটিত গণহত্যা ও ১৪ জন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে আজহারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।

সেই রায় বাতিল হওয়ায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবারই ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মিছিল হয়। বাম রাজনৈতিক দলগুলোও বিবৃতি দিয়ে আজহারের মুক্তির প্রতিবাদ জানিয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চের বিবৃতি

মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে খালাস করে দেওয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চ।  গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের ফেসবুক পোস্টে এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, গণজাগরণ মঞ্চ উদ্বেগের সাথে লক্ষ করেছে যে, ড. ইউনূসের সরকার এবং তার রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতারোহনের পর দেশের বিচার ব্যবস্থাকে একটি তামাশায় পরিণত করেছে। ড. ইউনূস ও তার দল দেশের শীর্ষ আদালতকে ঘেরাও করে, অন‍্যায‍্য চাপ প্রয়োগ করে ক্ষমতারোহনের পরপরই দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারকদেরকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এই প্রভাব প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা বিচারপতিদের কর্মস্থলের পাশাপাশি তাদের বাসভবন গুলোতেও হামলা চালায়।

এই মবোক্রেসি কায়েমের মাধ্যমে তারা বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ইতিমধ্যে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধের সকল রায় পরিবর্তন ও মামলা প্রত্যাহারের কাজ করেছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ বুদ্ধিজীবি ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরসহ দেশের শতশত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের ন্যায়বিচার ও জামিন প্রাপ্তিতে বাধার সৃষ্টি করেছে।

তারই ধারাবাহিকতায় একটি সম্পন্ন বিচার প্রক্রিয়া, যা আদালতে আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছিল, সেটিকে কথিত রিভিউয়ের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের খালাসকে তাই স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বলে মানা যায় না। রায়ের সাথে সাথেই আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিবৃতির মাধ্যমে এটিকে ”জুলাই গণআন্দোলনের অকুতোভয় নেতৃত্বের” কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করে প্রমাণ করেছেন যে এই খালাসের রায়টি সরকার অনায্য প্রভাব বিস্তার করে দেশের শীর্ষ আদালতকে প্রভাবিত করে রিভিউটি কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের পক্ষে নেয়া হয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চ এই রিভিউকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বিচার ব্যবস্থা পুনর্বহালে দেশের আপামর জনসাধারণের সংগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চ পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।

 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মুক্তি পেয়েই হাসপাতাল থেকে শাহবাগে আজহার; বললেন, ‘আমি এখন স্বাধীন’

আপডেট সময় : ০৩:১২:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ মে ২০২৫

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম মুক্তি পাওয়ার পরপরই ঢাকার শাহবাগ মোড়ে উপস্থিত হয়ে নিজেকে ‘স্বাধীন’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার পর চিকিৎসার জন্য তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে। বুধবার (২৮ মে ২০২৫) সকালে আপিল বিভাগের রায়ের পরপরই তাকে হাসপাতাল থেকেই মুক্তি দেওয়া হয়।

মুক্তি পাওয়ার পর একটি গাড়িতে করে শাহবাগ মোড়ে যান আজহার। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তার জন্য সংক্ষিপ্ত সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এই শাহবাগেই ২০১৩ সালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় এসেছিল।

বুধবার শাহবাগ মোড়ে পূর্বমুখী মঞ্চে ফুল দিয়ে আজহারের স্বাগত জানান জামায়াত নেতারা। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, টুপি ও চশমা পরা আজহার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “প্রায় ১৪ বছর কারাগারে থাকার পর আজ আমি মুক্ত। আজ আমি স্বাধীন। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক আমি এখন।”

২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, অপহরণ, হত্যা ও নির্যাতনের ছয়টি ঘটনায় আজহারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর আপিল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের সেই রায় বহাল রাখে।

রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর ২০২০ সালের ১৯ জুলাই তিনি পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের মধ্যেই মঙ্গলবার আপিল বিভাগ সেই রিভিউ শুনানি শেষে আজহারের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে মুক্তির আদেশ দেয়।

আজহার বলেন, “মহামান্য আদালতকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, তারা ন্যায়বিচার করেছেন। এতদিন ন্যায়বিচার ছিল না। আদালতকে ব্যবহার করা হয়েছে। আশা করি, সামনের দিনগুলোতে আদালত জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন।”

আইনজীবীদের ধন্যবাদ জানানোর পর তিনি ৩৬ জুলাই ও ৫ আগস্টের আন্দোলনের নেতা-নেত্রীদের কৃতজ্ঞতা জানান।

তিনি বলেন, “ধন্যবাদ যাদের কারণে আজ আমি মুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, সেই ৩৬ জুলাইয়ের, ৫ আগস্টের মহান বিপ্লবের নায়কদের। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আন্দোলনে স্বৈরাচার-ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হতে বাধ্য হয়েছিল। ধন্যবাদ জানাই ছাত্রসমাজকে, ছাত্রসমাজই রাজপথে রক্ত ঢেলে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছিল, যার কারণে নতুনভাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেতে পেরেছে।”

সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী জনগণের পক্ষ নেওয়ায় আজ আমরা এই অবস্থানে আসতে পেরেছি।”

আওয়ামী লীগের শাসনকালে যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডকে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেন আজহার।

তিনি বলেন, জামায়াতের শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মো. মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, মো. কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী — এদের সবাইকে ‘শহীদ’ করা হয়েছে। তাদের ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ করা হয়েছে।

“এই হত্যাকাণ্ডে যারা যে পর্যায়ে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক। এটা আমি জোর গলায় বলতে চাই। না হলে এই খারাপ সংস্কৃতি চালু থাকবে।”

সমাবেশে জানানো হয়, সেখান থেকে আজহারকে মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

প্রায় আধা ঘণ্টার এ সমাবেশে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বক্তব্য রাখেন। সঞ্চালক তাকে ‘স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের’ নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। উত্তরে শফিকুর রহমান বলেন, “এখানে বলা হয়েছে আমার নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে, মোটেই না। এদেশের ১৮ কোটি মজলুম মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায় সরকারের পতন হয়েছে। আমরা এই মূল ক্রেডিট আল্লাহকে দিই, জমিনের ক্রেডিট এই দেশের জনগণকে দেওয়ার পক্ষে।”

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে। তাতে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা অধিকাংশই বিচারের আওতায় আসেন।

২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায়ে জামায়াতের সাবেক নেতা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরের মাসে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তার রায়ের পর গড়ে ওঠে শাহবাগ আন্দোলন, যার প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধন করে রাষ্ট্রপক্ষকেও আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়। পরে আপিলে কাদের মোল্লার দণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় আপিলে কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আজহারই প্রথম খালাস ও মুক্তি পেলেন। ২০১২ সালের ২২ আগস্ট গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তিনি কারাবন্দি ছিলেন।

১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্র সংঘের রংপুর জেলা সভাপতি হিসেবে আল-বদর বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার ছিলেন আজহার। তার নেতৃত্বে গঠিত ৭০ জন সদস্যের বাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পত্রপত্রিকায় তার আল-বদর বাহিনীর সভা-সমাবেশে নেতৃত্ব দেওয়ার খবরও রয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর ইসলামী ছাত্র শিবির গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর জামায়াত ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসেন।

রংপুরে সংঘটিত গণহত্যা ও ১৪ জন নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে আজহারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।

সেই রায় বাতিল হওয়ায় দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবারই ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মিছিল হয়। বাম রাজনৈতিক দলগুলোও বিবৃতি দিয়ে আজহারের মুক্তির প্রতিবাদ জানিয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চের বিবৃতি

মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামকে খালাস করে দেওয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চ।  গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের ফেসবুক পোস্টে এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, গণজাগরণ মঞ্চ উদ্বেগের সাথে লক্ষ করেছে যে, ড. ইউনূসের সরকার এবং তার রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতারোহনের পর দেশের বিচার ব্যবস্থাকে একটি তামাশায় পরিণত করেছে। ড. ইউনূস ও তার দল দেশের শীর্ষ আদালতকে ঘেরাও করে, অন‍্যায‍্য চাপ প্রয়োগ করে ক্ষমতারোহনের পরপরই দেশের শীর্ষ আদালতের বিচারকদেরকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এই প্রভাব প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা বিচারপতিদের কর্মস্থলের পাশাপাশি তাদের বাসভবন গুলোতেও হামলা চালায়।

এই মবোক্রেসি কায়েমের মাধ্যমে তারা বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করে বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ইতিমধ্যে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধের সকল রায় পরিবর্তন ও মামলা প্রত্যাহারের কাজ করেছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ বুদ্ধিজীবি ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরসহ দেশের শতশত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের ন্যায়বিচার ও জামিন প্রাপ্তিতে বাধার সৃষ্টি করেছে।

তারই ধারাবাহিকতায় একটি সম্পন্ন বিচার প্রক্রিয়া, যা আদালতে আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছিল, সেটিকে কথিত রিভিউয়ের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের খালাসকে তাই স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বলে মানা যায় না। রায়ের সাথে সাথেই আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিবৃতির মাধ্যমে এটিকে ”জুলাই গণআন্দোলনের অকুতোভয় নেতৃত্বের” কৃতিত্ব হিসেবে দাবি করে প্রমাণ করেছেন যে এই খালাসের রায়টি সরকার অনায্য প্রভাব বিস্তার করে দেশের শীর্ষ আদালতকে প্রভাবিত করে রিভিউটি কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের পক্ষে নেয়া হয়েছে।

গণজাগরণ মঞ্চ এই রিভিউকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বিচার ব্যবস্থা পুনর্বহালে দেশের আপামর জনসাধারণের সংগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চ পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে।