জুলাই গণ–অভ্যুত্থান নিয়ে ৮৩৭টি হত্যা মামলা, ৪৫৩টিতেই শেখ হাসিনা আসামী
- আপডেট সময় : ০৮:৩২:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 34
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোর জেরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সারা দেশে মোট ৬৬৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। আজ সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্র–জনতার হত্যাকারী, হত্যার নির্দেশদাতা ও ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে সারা দেশে মোট ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৬৩টি মামলায় আসামি হিসেবে শেখ হাসিনার নাম রয়েছে।
মোট মামলার মধ্যে ৮৩৭টি হত্যা মামলা, যার ৪৫৩টিতে শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় ইতিমধ্যে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে।
টিআইবি জানায়, এ পর্যন্ত ১০৬টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা পড়েছে, যার মধ্যে ৩১টি হত্যা মামলা। এসব মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ মোট ১২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার সংখ্যার তুলনায় অভিযোগপত্রের সংখ্যা কম হওয়ায় তদন্ত কার্যক্রমের ধীরগতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুলাইয়ের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধেও ব্যাপক মামলা হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে ১ হাজার ১৬৮ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ৬১ জন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ৪৫০টি অভিযোগ দায়ের হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ৪৫টি। এসব মামলায় শেখ হাসিনাসহ ২০৯ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৮৪ জনকে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে ১২টি মামলা বিচারাধীন, যেখানে আসামির সংখ্যা ১০৫ জন।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক আসামি গোপনে দেশত্যাগ করেছেন। তাঁদের দেশত্যাগে সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে।
গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বিচার মামলা দায়ের ও ঢালাওভাবে আসামি করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটির হিসাবে, এসব মামলায় সারা দেশে প্রায় দেড় লাখ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১ হাজার ৮৫৪ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ১৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৮১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ৫৫ শতাংশ জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে মামলা ও গ্রেপ্তার–বাণিজ্য, প্রতিশোধমূলক মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি এবং মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে চাপের মুখে তদন্ত ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলা গ্রহণ করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়া বিচারক ও কৌঁসুলিদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।
বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়া এবং কিছু অগ্রগতি স্বীকার করলেও টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, মামলার ভিত্তি দুর্বল হওয়া, প্রতিবেদন তৈরিতে পদ্ধতিগত জটিলতা এবং ঘটনার স্পষ্ট চিত্রের অভাবে বিচারপ্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিচারের রায় সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সংস্থাটি বলেছে, ন্যায্য ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা হলে বিচারকার্য ও রায় নিয়ে সমালোচনা তৈরি হতে পারে। বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতায় প্রকৃত অপরাধীরাও দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পুলিশ সদস্যদের কর্মকাণ্ডের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থার বাইরে কার্যকর জবাবদিহি নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা ও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি অযৌক্তিক মামলা, বিনা বিচারে আটক, জামিনযোগ্য হলেও দীর্ঘদিন আটক রাখা, সরকারি প্রভাব খাটানো এবং সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের হত্যা মামলায় আসামি করার মতো পুরোনো চর্চা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম, মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ ফেলো ফারহানা রহমান, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মোস্তফা কামাল ও মোহাইমেনুল ইসলাম প্রমুখ।











