ঢাকা ০৭:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬, ১৬ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
প্রবাসীদের দাবিতে সিলেট-ম্যানচেস্টার ফ্লাইট বাঁচাতে বিএনপির উদ্যোগ ৬২টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী ৭২ জন  কাকরদিয়া- তেরাদল- আলিপুর এডুকেশন ট্রাস্ট ইউকের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু জামায়াত আমির বললেন, গালে হাত দিয়ে বসে থাকব না, গর্জে উঠব পাঁচ লাখ অভিবাসীকে বৈধ করবে স্পেন পৃথিবীতে জালিয়াতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ: প্রধান উপদেষ্টা পুরস্কার ঘোষণা করে কী লাভ হলো? লুটের অস্ত্র অপরাধীদের হাতে, নির্বাচন ঘিরে ‘বাড়তি উদ্বেগ’ পে স্কেল নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সরকারি কর্মচারীরা যুক্তরাজ্যে ‘অতিদারিদ্র্যে’ রেকর্ডসংখ্যক মানুষ, তালিকায় বাংলাদেশিরাও ভোট দিয়ে ফেলেছেন ৪ লাখ প্রবাসী

আ.লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দাবি ৬ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার

৫২ বাংলা
  • আপডেট সময় : ১২:৪৫:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
  • / 239

ইউনূসকে ৬ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার চিঠি

অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১২টি সুপারিশ বিবেচনায় নিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি যৌথভাবে খোলা চিঠি দিয়েছে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। একই সঙ্গে তারা মৌলিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইন সংস্কার উদ্যোগ এবং গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরুর মতো পদক্ষেপের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশংসা জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে এই খোলা চিঠি প্রকাশ করা হয়। সেখানে সরকারের উদ্দেশে যে ১২টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো হলো— জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা খাতে সংস্কার, গুমের অপরাধ নির্ধারণ ও তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার, ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নজরদারি সীমিতকরণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সিভিল সোসাইটি ও এনজিওর স্বাধীনতা, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে সহযোগিতা।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে— সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, ফর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।

চিঠির শুরুতে সরকারের প্রশংসা করে বলা হয়, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আমাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য আমরা আপনার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে স্বল্প এই অন্তর্বর্তী সময়ে মানবাধিকার সুরক্ষা আরও বিস্তৃত করতে এবং বাংলাদেশে এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আহ্বান জানানো হয়, যা স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি প্রতিহত করবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, “আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, নিরাপত্তা খাতে এখনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য জবাবদিহিতা ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে না।”

পূর্ববর্তী সরকারের সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি চলমান নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক— বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট যেসব মামলার প্রমাণ নেই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়— তা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয় চিঠিতে।

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বলা হয়, জাতিসংঘের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে আপনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান হলো স্বদেশ প্রত্যাবাসন এবং ‘তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ’ হিসেবে নতুন আগত শরণার্থীদের ‘ফিরে যেতে দিতে হবে’। তবে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে আগত প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাসহ কারও জন্যই বর্তমানে মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষায় চিঠিতে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

১. জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা

জুলাই বিপ্লব ও গত ১৫ বছরে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিযোগ গঠন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে— এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেনাবাহিনীকে এই বিচার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা দিতে হবে এবং আইসিটির বেসামরিক এখতিয়ারকে সম্মান করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে— আইসিটির কাঠামো, সম্পদ ও স্বাধীনতা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, যাতে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নির্বিশেষে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ন্যায়বিচার করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়।

২. নিরাপত্তা খাতে সংস্কার

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করা এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই)-এর ক্ষমতা সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়, যাতে অতীতের দমনপীড়নের ধারা থেকে সরে মানবাধিকারসম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। র‌্যাবের নির্যাতন, হত্যা ও গুমের ইতিহাস এই সংস্থাকে সংস্কারের বাইরে নিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। সকল সামরিক সদস্যকে বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে প্রত্যাহার এবং ডিজিএফআইয়ের ভূমিকা আইনি কাঠামোর মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

৩. গুমের অপরাধ নির্ধারণ ও তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী গুমকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ অবিলম্বে পাস করতে হবে— তবে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। গুম তদন্ত কমিশনকে পর্যাপ্ত সময়, সম্পদ ও তদন্তে পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতে হবে।

৪. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার

‘প্যারিস প্রিন্সিপল’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে। কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে।

৫. ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার

২০২৫ সালের ‘সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ’সহ সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ও ফৌজদারি আইনের মানহানির ধারা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বাতিল বা সংশোধন করার আহ্বান জানানো হয়। ২০২৩ সালের সাইবার সিকিউরিটি আইন বাতিলের পরও নতুন অধ্যাদেশে অস্পষ্ট ধারা রয়ে গেছে, যা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

৬. ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নজরদারি সীমিতকরণ

‘পারসোনাল ডাটা প্রোটেকশন অধ্যাদেশ’ ও ‘ন্যাশনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট অধ্যাদেশ’-এর খসড়া আন্তর্জাতিক মানে সংশোধন করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের জন্য অতিরিক্ত ছাড় না থেকে নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষা হয়।

৭. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক সুরক্ষা

সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পক্ষপাতের অজুহাতে হয়রানি, গ্রেপ্তার বা হামলা থেকে রক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন জরুরি।

৮. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার

আগস্ট ২০২৪-এর আগে ও পরে দায়ের হওয়া সব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা পর্যালোচনা করে বাতিল করতে হবে, বিশেষ করে যেগুলোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।

৯. আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে দেওয়া সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এটি গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও বহুদলীয় রাজনীতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। জাতিসংঘের ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গণতান্ত্রিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।”

১০. সিভিল সোসাইটি ও এনজিও স্বাধীনতা

এনজিও বিষয়ক ব্যুরো সংস্কার করতে হবে, যাতে এটি নাগরিক সংগঠনগুলোকে হয়রানি বা বিদেশি অর্থায়নে বাধা দেওয়ার হাতিয়ার না হয়। বিদেশি অনুদান (স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম) নিয়ন্ত্রণ আইন পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়।

১১. রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো বন্ধ করতে হবে। ক্যাম্পে চলাচল, জীবিকা ও শিক্ষায় আরোপিত সীমাবদ্ধতা কমিয়ে মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে।

১২. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে সহযোগিতা

বাংলাদেশ-মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আইসিসির চলমান তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে এবং আদালতের ওয়ারেন্টে অভিযুক্ত কেউ বাংলাদেশে থাকলে তাকে হস্তান্তর করতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আ.লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দাবি ৬ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার

আপডেট সময় : ১২:৪৫:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ১২টি সুপারিশ বিবেচনায় নিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি যৌথভাবে খোলা চিঠি দিয়েছে ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। একই সঙ্গে তারা মৌলিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইন সংস্কার উদ্যোগ এবং গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরুর মতো পদক্ষেপের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশংসা জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে এই খোলা চিঠি প্রকাশ করা হয়। সেখানে সরকারের উদ্দেশে যে ১২টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো হলো— জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তা খাতে সংস্কার, গুমের অপরাধ নির্ধারণ ও তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার, ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নজরদারি সীমিতকরণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সিভিল সোসাইটি ও এনজিওর স্বাধীনতা, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে সহযোগিতা।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে— সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, ফর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।

চিঠির শুরুতে সরকারের প্রশংসা করে বলা হয়, “জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আমাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করার জন্য আমরা আপনার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।”

২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে স্বল্প এই অন্তর্বর্তী সময়ে মানবাধিকার সুরক্ষা আরও বিস্তৃত করতে এবং বাংলাদেশে এমন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আহ্বান জানানো হয়, যা স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী শাসনের ঝুঁকি প্রতিহত করবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, “আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, নিরাপত্তা খাতে এখনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য জবাবদিহিতা ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছে না।”

পূর্ববর্তী সরকারের সময় সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি চলমান নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক— বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট যেসব মামলার প্রমাণ নেই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হয়— তা অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয় চিঠিতে।

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বলা হয়, জাতিসংঘের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে আপনি বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান হলো স্বদেশ প্রত্যাবাসন এবং ‘তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ’ হিসেবে নতুন আগত শরণার্থীদের ‘ফিরে যেতে দিতে হবে’। তবে রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে আগত প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাসহ কারও জন্যই বর্তমানে মিয়ানমারে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষায় চিঠিতে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

১. জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা

জুলাই বিপ্লব ও গত ১৫ বছরে সংঘটিত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুম ও নির্যাতনকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিযোগ গঠন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে— এটিকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেনাবাহিনীকে এই বিচার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা দিতে হবে এবং আইসিটির বেসামরিক এখতিয়ারকে সম্মান করতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে— আইসিটির কাঠামো, সম্পদ ও স্বাধীনতা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, যাতে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নির্বিশেষে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ন্যায়বিচার করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়।

২. নিরাপত্তা খাতে সংস্কার

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করা এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই)-এর ক্ষমতা সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়, যাতে অতীতের দমনপীড়নের ধারা থেকে সরে মানবাধিকারসম্মত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। র‌্যাবের নির্যাতন, হত্যা ও গুমের ইতিহাস এই সংস্থাকে সংস্কারের বাইরে নিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। সকল সামরিক সদস্যকে বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে প্রত্যাহার এবং ডিজিএফআইয়ের ভূমিকা আইনি কাঠামোর মধ্যে সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

৩. গুমের অপরাধ নির্ধারণ ও তদন্ত কমিশন শক্তিশালীকরণ

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী গুমকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ’ অবিলম্বে পাস করতে হবে— তবে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। গুম তদন্ত কমিশনকে পর্যাপ্ত সময়, সম্পদ ও তদন্তে পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতে হবে।

৪. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার

‘প্যারিস প্রিন্সিপল’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (এনএইচআরসি) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে। কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে।

৫. ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আইন সংস্কার

২০২৫ সালের ‘সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ’সহ সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ও ফৌজদারি আইনের মানহানির ধারা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বাতিল বা সংশোধন করার আহ্বান জানানো হয়। ২০২৩ সালের সাইবার সিকিউরিটি আইন বাতিলের পরও নতুন অধ্যাদেশে অস্পষ্ট ধারা রয়ে গেছে, যা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

৬. ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নজরদারি সীমিতকরণ

‘পারসোনাল ডাটা প্রোটেকশন অধ্যাদেশ’ ও ‘ন্যাশনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট অধ্যাদেশ’-এর খসড়া আন্তর্জাতিক মানে সংশোধন করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের জন্য অতিরিক্ত ছাড় না থেকে নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষা হয়।

৭. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক সুরক্ষা

সাংবাদিকদের রাজনৈতিক পক্ষপাতের অজুহাতে হয়রানি, গ্রেপ্তার বা হামলা থেকে রক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন জরুরি।

৮. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার

আগস্ট ২০২৪-এর আগে ও পরে দায়ের হওয়া সব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা পর্যালোচনা করে বাতিল করতে হবে, বিশেষ করে যেগুলোর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।

৯. আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে দেওয়া সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। এটি গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও বহুদলীয় রাজনীতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে। জাতিসংঘের ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গণতান্ত্রিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।”

১০. সিভিল সোসাইটি ও এনজিও স্বাধীনতা

এনজিও বিষয়ক ব্যুরো সংস্কার করতে হবে, যাতে এটি নাগরিক সংগঠনগুলোকে হয়রানি বা বিদেশি অর্থায়নে বাধা দেওয়ার হাতিয়ার না হয়। বিদেশি অনুদান (স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম) নিয়ন্ত্রণ আইন পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়।

১১. রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো বন্ধ করতে হবে। ক্যাম্পে চলাচল, জীবিকা ও শিক্ষায় আরোপিত সীমাবদ্ধতা কমিয়ে মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে।

১২. আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গে সহযোগিতা

বাংলাদেশ-মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আইসিসির চলমান তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে এবং আদালতের ওয়ারেন্টে অভিযুক্ত কেউ বাংলাদেশে থাকলে তাকে হস্তান্তর করতে হবে।