ঢাকা ১২:৩৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অস্থির বিএনপি : আট মাসে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিহত

৫২ বাংলা
  • আপডেট সময় : ১১:৩৬:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ মে ২০২৫
  • / 346
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছে। সংঘাত-সহিংসতায় দলের নেতাকর্মীদের নাম উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে।

শুধু গত এপ্রিল মাসেই দলের অন্তত সাতজন নেতাকর্মী অভ্যন্তরীণ বিরোধে প্রাণ হারিয়েছেন। আর অগাস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত গণমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যমতে, এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে অর্ধশতাধিক।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারাও এই সহিংসতার বিষয়টি স্বীকার করছেন। তারা দাবি করছেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তবে বিএনপির এই দাবি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বলছে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা বেড়েই চলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ, দখলদারিত্ব এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তারা মনে করেন, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, এই ধরণের সংঘর্ষ ততই বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।


“দলের জন্য গুলি খেয়েছি, অথচ পাশে কেউ নেই”

৫ এপ্রিল রংপুরের বদরগঞ্জে আধিপত্য বিস্তার এবং এক ব্যবসায়ীকে মারধরের ঘটনার প্রতিবাদে ডাকা মানববন্ধনে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন কর্মী লাভলু মিয়া।

নিহতের ছেলে রায়হান কবির ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও শতাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার অভিযোগ, অভিযুক্তরা অর্থবলে আগাম জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “আমার বাবা বিএনপির জন্য জেল খেটেছেন, আগুনে পুড়েছেন, গুলি খেয়েছেন। আজ যখন তার মৃত্যু হলো, তখন কেউ পাশে নেই। এটা যদি হয় রাজনীতি, তাহলে কেউ যেন আর রাজনীতি না করে।”

যদিও এই ঘটনার পর দলীয় সিদ্ধান্তে ছয়জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।

এর এক সপ্তাহ পর, ১১ এপ্রিল গাজীপুরের ধীরাশ্রমে নিজ বাড়ির পাশে কুপিয়ে হত্যা করা হয় কৃষকদল নেতা রাকিব মোল্লাকে। স্থানীয়ভাবে ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

রাকিবের মা রুবিনা আক্তার সীমা বলেন, “আমার ছেলে বিএনপির নেতার জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল, বাকিরা সেখানে পৌঁছাতে পারবে না বলেই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির একাংশ মামলাটি দুর্বল করার চেষ্টা করছে।


অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ৮ মাসে বিএনপির ৫৮ নেতাকর্মী নিহত

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ জন, যার মধ্যে ২৬ জনই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার।

অগাস্ট ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত ৮ মাসে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ জনে, যার মধ্যে ৫৮ জনের মৃত্যুর পেছনে রয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা।

বিষয়টি স্বীকার করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “সংঘাত একেবারে নেই, এমন বলছি না। তবে কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি। বহিষ্কার, শোকজ, পদ স্থগিতসহ সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, দলীয় তদন্ত ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিন থেকে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিক্রিয়াও এর পেছনে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


“নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, সংকট তত বাড়বে”

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা, শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং নেতৃত্ব সংকট বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মূল কারণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “১৭-১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপি অনেকটাই ভারসাম্য হারিয়েছে। চেয়ারপারসন নিষ্ক্রিয়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন দেশের বাইরে। এতে করে দল পরিচালনায় সংকট তৈরি হয়েছে।”

তিনি মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়ার সক্রিয় সময়ে এসব সমস্যা ধামাচাপা থাকলেও এখন তা প্রকাশ্য। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যকার মতপার্থক্য দলের সংহতি দুর্বল করেছে, যার প্রভাব পড়বে নির্বাচনে।

তাঁর মতে, “নির্বাচন সামনে এলে প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে আরও বিভেদ তৈরি হবে। যার যার বলয় থেকে মনোনয়ন চাওয়া, একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া—এসব পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে।”

আরেক বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, দলের অভ্যন্তরীণ সহিংসতার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা।

তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার, জাতীয় নির্বাচন এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ—এই তিন স্তরের প্রভাব বিস্তারই এসব সহিংসতার মূল কারণ।”

তাঁর মতে, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোরপূর্বক দখল প্রতিষ্ঠার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেক সময় তা বেআইনি হলেও সামাজিকভাবে তা মেনে নেওয়া হয়। ফলে দলে দীর্ঘদিন থাকা ব্যক্তিরা অর্থনৈতিক সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছেন।”

সূত্র : তানহা তাসনিম, বিবিসি নিউজ বাংলা

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অস্থির বিএনপি : আট মাসে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিহত

আপডেট সময় : ১১:৩৬:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ মে ২০২৫

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছে। সংঘাত-সহিংসতায় দলের নেতাকর্মীদের নাম উঠে আসছে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে।

শুধু গত এপ্রিল মাসেই দলের অন্তত সাতজন নেতাকর্মী অভ্যন্তরীণ বিরোধে প্রাণ হারিয়েছেন। আর অগাস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত গণমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যমতে, এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে অর্ধশতাধিক।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারাও এই সহিংসতার বিষয়টি স্বীকার করছেন। তারা দাবি করছেন, সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তবে বিএনপির এই দাবি পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য বলছে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা বেড়েই চলেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ, দখলদারিত্ব এবং আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা। তারা মনে করেন, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, এই ধরণের সংঘর্ষ ততই বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।


“দলের জন্য গুলি খেয়েছি, অথচ পাশে কেউ নেই”

৫ এপ্রিল রংপুরের বদরগঞ্জে আধিপত্য বিস্তার এবং এক ব্যবসায়ীকে মারধরের ঘটনার প্রতিবাদে ডাকা মানববন্ধনে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন কর্মী লাভলু মিয়া।

নিহতের ছেলে রায়হান কবির ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও শতাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তার অভিযোগ, অভিযুক্তরা অর্থবলে আগাম জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “আমার বাবা বিএনপির জন্য জেল খেটেছেন, আগুনে পুড়েছেন, গুলি খেয়েছেন। আজ যখন তার মৃত্যু হলো, তখন কেউ পাশে নেই। এটা যদি হয় রাজনীতি, তাহলে কেউ যেন আর রাজনীতি না করে।”

যদিও এই ঘটনার পর দলীয় সিদ্ধান্তে ছয়জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়।

এর এক সপ্তাহ পর, ১১ এপ্রিল গাজীপুরের ধীরাশ্রমে নিজ বাড়ির পাশে কুপিয়ে হত্যা করা হয় কৃষকদল নেতা রাকিব মোল্লাকে। স্থানীয়ভাবে ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

রাকিবের মা রুবিনা আক্তার সীমা বলেন, “আমার ছেলে বিএনপির নেতার জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল, বাকিরা সেখানে পৌঁছাতে পারবে না বলেই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।”

তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপির একাংশ মামলাটি দুর্বল করার চেষ্টা করছে।


অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ৮ মাসে বিএনপির ৫৮ নেতাকর্মী নিহত

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ জন, যার মধ্যে ২৬ জনই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার।

অগাস্ট ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত ৮ মাসে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ জনে, যার মধ্যে ৫৮ জনের মৃত্যুর পেছনে রয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা।

বিষয়টি স্বীকার করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “সংঘাত একেবারে নেই, এমন বলছি না। তবে কাউকে ছাড় দেওয়া হয়নি। বহিষ্কার, শোকজ, পদ স্থগিতসহ সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, দলীয় তদন্ত ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিন থেকে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিক্রিয়াও এর পেছনে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।


“নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, সংকট তত বাড়বে”

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা, শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং নেতৃত্ব সংকট বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মূল কারণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “১৭-১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপি অনেকটাই ভারসাম্য হারিয়েছে। চেয়ারপারসন নিষ্ক্রিয়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন দেশের বাইরে। এতে করে দল পরিচালনায় সংকট তৈরি হয়েছে।”

তিনি মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়ার সক্রিয় সময়ে এসব সমস্যা ধামাচাপা থাকলেও এখন তা প্রকাশ্য। বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যকার মতপার্থক্য দলের সংহতি দুর্বল করেছে, যার প্রভাব পড়বে নির্বাচনে।

তাঁর মতে, “নির্বাচন সামনে এলে প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে আরও বিভেদ তৈরি হবে। যার যার বলয় থেকে মনোনয়ন চাওয়া, একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া—এসব পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে।”

আরেক বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম মনে করেন, দলের অভ্যন্তরীণ সহিংসতার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা।

তিনি বলেন, “স্থানীয় সরকার, জাতীয় নির্বাচন এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণ—এই তিন স্তরের প্রভাব বিস্তারই এসব সহিংসতার মূল কারণ।”

তাঁর মতে, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোরপূর্বক দখল প্রতিষ্ঠার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। অনেক সময় তা বেআইনি হলেও সামাজিকভাবে তা মেনে নেওয়া হয়। ফলে দলে দীর্ঘদিন থাকা ব্যক্তিরা অর্থনৈতিক সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছেন।”

সূত্র : তানহা তাসনিম, বিবিসি নিউজ বাংলা